দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, আর তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ফলাফল অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল।
তবে ভোটের এই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে- দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেও রাষ্ট্রপতির হাতে আসলে কতটা ক্ষমতা থাকে? সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করলে কোথায় তিনি এগিয়ে, আর কোথায় তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ?
মর্যাদায় শীর্ষে, নির্বাহী ক্ষমতায় নয়
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। সংবিধান তাকে দেশের অন্য সব নাগরিক ও পদের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে এবং রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সব কার্যক্রম তার নামেই পরিচালিত হয়। কিন্তু এই মর্যাদার সঙ্গে বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতার সম্পর্ক সরাসরি নয়। সরকার পরিচালনার প্রকৃত ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন- এখানেই দুই পদের মৌলিক ফারাক।
যে দুই জায়গায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে
ক্ষমতার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতির প্রায় সব সিদ্ধান্তই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর, কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন- আর সেই দুই ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভূমিকা নেই। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) মতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অনুচ্ছেদ ৯৫(১) মতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ- এই দুই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতি কারও পরামর্শ মানতে বাধ্য নন। এই অর্থে এই দুই ক্ষমতায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কাঠামোগতভাবে এগিয়ে, কেননা প্রধানমন্ত্রী নিজে কখনো নিজের উত্তরসূরি বা প্রধান বিচারপতি একক ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিতে পারেন না।
তবে বাস্তবে এই স্বাধীনতার পরিসরও পরিস্থিতিনির্ভর। সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া ছাড়া রাষ্ট্রপতির সামনে বিকল্প থাকে না। কিন্তু কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কে সরকার গঠন করবেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক বিচক্ষণতা তখন সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে অবশ্য এই শর্তহীনতা সব সময়ই বহাল থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি সাংবিধানিক সুরক্ষা রাষ্ট্রপতির অবস্থানকে শক্তিশালী করে- প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, বা দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো আদালত প্রশ্ন তুলতে বা তদন্ত করতে পারে না। ফলে প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির পরামর্শ-প্রক্রিয়া কার্যত বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার বাইরে থাকে।
যে জায়গায় রাষ্ট্রপতি পিছিয়ে
এই দুই ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাকি প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে চলতে হয়- এটিই সংসদীয় ব্যবস্থার মূল কাঠামো। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে অধিকাংশ নিয়োগ পর্যন্ত সবকিছুতেই মন্ত্রিসভার পরামর্শই চূড়ান্ত বিবেচ্য। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে নিয়মিত অবহিত রাখেন বটে, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা মন্ত্রিসভার হাতেই থাকে। রাষ্ট্রপতি চাইলে কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠানোর অনুরোধ জানাতে পারেন, কিন্তু সেই অনুরোধ মানা না-মানা কার্যত সরকারের এখতিয়ারে।
এ ছাড়া দণ্ড মার্জনার ক্ষমতাও (সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ) রাষ্ট্রপতির নামেই প্রয়োগ হয়, কিন্তু এখানেও সরকারের পরামর্শই মূল নির্ধারক- রাষ্ট্রপতি নিজের বিবেচনায় স্বাধীনভাবে কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না।
সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি ক্ষমতার উৎসে। প্রধানমন্ত্রী পান সংসদের সরাসরি আস্থা ও জনগণের ভোটের বৈধতা, যা তাকে নির্বাহী সিদ্ধান্তের প্রকৃত মালিক বানায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে, জনগণের সরাসরি ভোটে নয়- ফলে তার বৈধতার ভিত্তি ভিন্ন এবং তুলনামূলক পরোক্ষ।
যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে সুরক্ষিত
ক্ষমতার হিসাবে পিছিয়ে থাকলেও সাংবিধানিক সুরক্ষা ও ধারাবাহিকতার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি বরং এগিয়ে। দায়িত্ব পালনকালে তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না, তার মেয়াদে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা যায় না এবং গ্রেফতারের জন্য কোনো পরোয়ানাও জারি করা যায় না। প্রধানমন্ত্রীর এমন ব্যাপক দায়মুক্তি নেই।
রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে সরানোও সহজ নয়। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে অভিশংসন করতে হলে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়, রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়, আর শেষে সংসদের মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস করতে হয়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে অনাস্থা ভোটেই অপসারণ করা সম্ভব- তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশে অভিশংসনের একমাত্র উল্লেখযোগ্য নজির এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনা- ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি পদত্যাগ করেন।
সুযোগ-সুবিধায়ও এগিয়ে রাষ্ট্রপতি
আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেও রাষ্ট্রপতির পদটি প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ। দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। তুলনায় প্রধানমন্ত্রীর বেতন কিছুটা কম, ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আরও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ধারাবাহিকতায়: প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার পর কোনো সরকারি সুবিধা পান না, কিন্তু রাষ্ট্রপতি অবসর বা পদত্যাগের পরও কিছু সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন, সরকারি গাড়ি ও পরিবহনসুবিধা, বিদেশ সফরে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা, নিরীক্ষামুক্ত বার্ষিক আপ্যায়ন ভাতা এবং বছরে ২৭ লাখ টাকার বিমানভ্রমণ বিমাসুবিধা। এ ছাড়া রয়েছে বছরে দুই কোটি টাকার একটি স্বেচ্ছাধীন তহবিল, যা রাষ্ট্রপতি নিজের বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে ব্যয় করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশের যেকোনো হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসুবিধা পান, এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।
রাজনৈতিক সংকটে কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপতি
স্বাভাবিক সময়ে, বিশেষত সংসদে কোনো দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে, রাষ্ট্রপতির বিবেচনামূলক ক্ষমতার পরিসর যথেষ্ট সীমিত থাকে- যেমনটি এবারের নির্বাচনেও দেখা গেছে, যেখানে ফলাফল কার্যত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে, বিশেষত কোনো দল সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে, সরকার গঠনের প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা হঠাৎ-ই সিদ্ধান্তমূলক হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের আলোচনা থাকলেও তা এখনো কার্যকর কোনো রূপ পায়নি।
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিন তার ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষিত হবে, যেখানে পরবর্তী সময়ে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত ২৪ জুলাই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এরপর থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় সংকীর্ণ পরিসরে হলেও নির্দিষ্ট দুটি জায়গায় স্বাধীন ও নিরঙ্কুশ, আবার সাংবিধানিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার দিক থেকে তিনি স্পষ্টতই এগিয়ে। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই- মর্যাদায় শীর্ষে, ক্ষমতায় সীমিত-রাষ্ট্রপতি পদটিকে প্রতিবারই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।

