...|...|...

খুলনা

প্রধান শিক্ষক শূন্য যশোর-নড়াইলের এক হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়

মণিরামপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১:২৩ | আপডেট: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:৪০
Shares
প্রধান শিক্ষক শূন্য যশোর-নড়াইলের এক হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুই প্রতিবেশী জেলা যশোর ও নড়াইলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

জেলা দুটির ১ হাজার ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে দাফতরিক ও প্রশাসনিক কাজ। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং শিক্ষার গুণগত মানের ওপর।

সহকারী শিক্ষকরা একাধারে দাফতরিক নথিপত্র সামলানো, শিক্ষা অফিসের নানামুখী কাজে অংশ নেওয়া এবং অনলাইনে বিভিন্ন সরকারি তথ্য প্রেরণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অতিরিক্ত কাজের চাপে শিক্ষক ও কর্মকর্তা উভয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেও সহকারী শিক্ষকের পদমর্যাদা ও স্কেলেই বেতন পাচ্ছেন ভারপ্রাপ্তরা, যা তাদের মধ্যে তৈরি করছে তীব্র পেশাগত হতাশা। যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলার মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৯১টি প্রতিষ্ঠানেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।

ফলে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্যতার শীর্ষে রয়েছে মণিরামপুর উপজেলা। এই উপজেলার মোট ২৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৮টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠান প্রধান ছাড়া চলছে।

জেলা সদরে ২৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৬টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। এছাড়া শার্শা উপজেলায় ১২৫টির মধ্যে ৮২টি, চৌগাছায় ১৩৯টির মধ্যে ৭৬টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টির মধ্যে ৭২টি, অভয়নগরে ১১৭টির মধ্যে ৭০টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টির মধ্যে ৬১টি এবং কেশবপুর উপজেলার ১৩৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬টি পদে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। 

চৌগাছা উপজেলার শিক্ষক প্রতিনিধি ফাতেমা খাতুন জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকার কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কাজের চরম শূন্যতা তৈরি হয়েছে। একই সাথে পাঠদানের মূল কাজ অর্থাৎ একাডেমিক তদারকি শিথিল হয়ে পড়েছে। একজন সহকারী শিক্ষককে যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বানানো হয়, তখন তাকে প্রতিনিয়ত দাফতরিক প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে তিনি নির্ধারিত ক্লাসগুলো নিতে পারেন না। এতে স্বাভাবিকভাবেই অন্য শিক্ষকদের ওপর বাড়তি ক্লাসের চাপ পড়ে।

কেশবপুরের শিক্ষক আফসার আলী বলেন, ‘অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের মূল কাজ অর্থাৎ ক্লাসে পড়ানো ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনিক কাজের চাপ এতই বেশি যে, ক্লাসের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে না। দ্রুত এসব শূন্যপদে স্থায়ী নিয়োগ বা পদায়ন না করা হলে এ পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

যশোর সদর উপজেলা শিক্ষা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি আনিসুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি থাকার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষা অফিসের সাথে সমন্বয়, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, স্থানীয় প্রশাসনিক সভা এবং শিক্ষা সংক্রান্ত নানা অনলাইন তথ্য প্রস্তুত করতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হয়।

যশোরের সিনিয়র শিক্ষাবিদ ড. মাহবুবুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দিয়ে একটা পুরো জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালানো কোনো সুস্থ ধারার প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে না। এটি প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর। সেখানে যদি প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব না থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের শিখনফল কখনোই মানসম্মত হতে পারে না। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সবসময় এক ধরণের অস্থায়ী মানসিকতায় থাকেন, যার ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বা পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারেন না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জি এম আলমগীর কবির জানান, শূন্য পদের তালিকা এবং জেলার সার্বিক চিত্র প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হচ্ছে। এটি একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়। প্রয়োজনীয় দাফতরিক ও প্রশাসনিক কাজ শেষে দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়ন করা গেলে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে গতি ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংকট আরও গভীর নড়াইল জেলায়। জেলার ৪৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। গাণিতিক হিসাবে জেলার প্রায় ৬৫ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার তিনটি উপজেলাতেই এই সমস্যা বিস্তৃত। কালিয়া উপজেলার ১৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৮টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। লোহাগড়া উপজেলার ১৬৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১২টি এবং নড়াইল সদর উপজেলার ১৭৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি।

জেলায় যেসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, সেখানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের ডিএসবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ টানা যেতে পারে। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭৪ সালে জাতীয়করণ হওয়া এই পুরনো বিদ্যাপীঠে বর্তমানে ১৩২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। বাধ্য হয়ে একজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে সব কাজ পরিচালনা করছেন।

ডিএসবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা পারভীন বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে প্রায়ই উপজেলা শিক্ষা অফিসে ছুটতে হয়। বিভিন্ন মিটিং, রিপোর্ট জমা দেওয়া এবং দাফতরিক নথিপত্র সংরক্ষণে দিনের একটি বড় সময় চলে যায়। ফলে নিজের বরাদ্দ করা ক্লাসে যাওয়া সম্ভব হয় না। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মার খাচ্ছে। একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোনিয়া খানম জানান, যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাফতরিক কাজে বাইরে থাকেন বা অফিসে ব্যস্ত থাকেন, তখন উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষককেই সব শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হয়। শিক্ষক সংখ্যা কম হওয়ায় তারা নিজেরাও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

অন্যদিকে তুলারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র তুলে ধরে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কৃপা সিকদার আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি ২০১৮ সাল থেকে, অর্থাৎ দীর্ঘ আট বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ তিনি এখনও সহকারী শিক্ষকের স্কেলেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

কৃপা সিকদার বলেন, ‘দায়িত্ব পালন করছি প্রধান শিক্ষকের, কিন্তু বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি সহকারী শিক্ষকের। বছর পর বছর ধরে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানসিক ও পেশাগত হতাশা তৈরি হচ্ছে। পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা ছাড়া দায়িত্ব সামলানো দীর্ঘমেয়াদে কঠিন।

নড়াইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের বিপুল সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর ফলে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কাজ চালানো কঠিন হচ্ছে, তেমনি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শূন্য পদের বিস্তারিত তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির মাধ্যমে এই পদগুলো পূরণ করা গেলে জেলায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও গতিশীলতা ফিরে আসবে।

যশোরের ৮টি উপজেলা এবং নড়াইলের ৩টি উপজেলার সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় অভিভাবকহীন অবস্থায় চলছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কেবল প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক তদারকিরও কেন্দ্রবিন্দু। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদটি ফাঁকা থাকার অর্থ হলো সেখানকার সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের গুণগত শিখন সময় থেকে বঞ্চিত করা।

স্থানীয় অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মান ধরে রাখতে এবং কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি গড়তে অবিলম্বে শূন্য পদে নতুন নিয়োগ অথবা দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় যশোর ও নড়াইল অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে স্থবিরতা ও ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।