...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

পেনশনের টাকা উত্তোলনে তিনবার ‘মৃত্যু’ কবিরের

মৃত্যুসনদ দুবার গ্রহণ ও নমিনি পরিবর্তন করে মাত্র পৌনে দুই লাখ টাকার জন্য জালিয়াতি

এনায়েত শাওন
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:২৯ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:০৫
Shares
পেনশনের টাকা উত্তোলনে তিনবার ‘মৃত্যু’ কবিরের

জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে তিনবার নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়েও শেষ পর্যন্ত টাকা পাননি একজন গ্রাহক। দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী কবির হোসেন শরীফ নামের ওই পেনশন স্কিমধারী মুনাফাসহ পৌনে দুই লাখ টাকা তুলতে একাধিক মৃত্যুসনদ জমা দেওয়ার পাশাপাশি নমিনিও পরিবর্তন করেন। তবে কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে তার জালিয়াতির চেষ্টা ধরা পড়ে। অর্থ না পাওয়ার পাশাপাশি এখন তাকে আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে তিনবার মৃত্যুর মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজের জমানো টাকা মুনাফাসহ উত্তোলন করার চেষ্টা করেছিলেন কবির। প্রথম দুবার একই মৃত্যুর সনদ ও নমিনিসহ আবেদন করলেও তা পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। তৃতীয়বার নতুন করে মৃত্যুসনদ ও নমিনি পরিবর্তনের মাধ্যমে আবেদন করে অর্থ তসরুপের চেষ্টা করেন। এমনকি পেনশন কর্তৃপক্ষ পেনশনারের নমিনির ব্যাংক হিসাবে টাকা পর্যন্ত প্রেরণ করেন। শেষমুহূর্তে পেনশন কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হওয়ায় ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে টাকা উত্তোলন ঠেকিয়ে ধরা হয় জালিয়াত কবিরকে। অভিনব কায়দায় পেনশনের অর্থ লোপাটের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পেনশন কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান টাইমস টুডেকে বলেন, টাকা উত্তোলনের চেষ্টা হয়েছিল, আমরা তা শনাক্ত করে ফেলায় শেষ পর্যন্ত অর্থ তুলে নিতে পারেনি। এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন, আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে রমনা থানায় মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সুরক্ষা স্কিমের ৫ হাজার টাকা মাসিক কিস্তিতে একজন পেনশনার হিসেবে নিবন্ধন করেন কবির হোসেন শরীফ। আগস্ট ২০২৩ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এই গ্রাহকের মোট জমাকৃত টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এই সময়ে গ্রাহকের অর্জিত মুনাফা ১১ হাজার তিনশত সাতাশ টাকা। ঠিকঠাক কিস্তি প্রদান করা গ্রাহক কবির হঠাৎই চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি মৃত্যুজনিত কারণ দেখিয়ে অর্থ ফেরত চেয়ে আবেদন করে। প্রথম মৃত্যুর নিবন্ধন সনদ নম্বর ১৯৮০২৬৯৭৫৫৬৩৭১৮৫৫। কিন্তু পেনশন কর্তৃপক্ষ সেই আবেদনে যথার্থতা খুঁজে না পাওয়ায় সেই আবেদন নাকচ করে দেন। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি একই মৃত্যুর তারিখ ও সনদ দিয়ে দ্বিতীয়বার আবেদন করলে পেনশন কর্তৃপক্ষ সেই আবেদনও খারিজ করে দেওয়ায় কবিরের টাকা পাওয়ার মনোবাসনা দীর্ঘায়িত হয়।

নথিপত্র বলছে, দুইবার অর্থ উত্তোলনে ব্যর্থ হয়ে তৃতীয় দফায় মৃত্যুর আগে নমিনি পরিবর্তন করেন অভিযুক্ত কবির। এই দফায় সুরক্ষা স্কিমের শুরুতে দেওয়া নমিনি স্ত্রী শামসুন নাহার মনিকে বাদ দিয়ে এপ্রিলের ২৮ তারিখ নতুন নমিনি হিসেবে মনোনীত করেন মো. আপন মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে। জালিয়াতির মাধ্যমে নমিনি পরিবর্তন করার দিনই কবিরও মৃত্যুবরণ করেন। ঠিক দুদিন পর ৩০ এপ্রিল নতুন নমিনির হিসাবে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। এবার তার মৃত্যুর নতুন নিবন্ধন সনদ নম্বর ১৯৮২১২১৮৫৭২১২১০৪৮ ব্যবহার করা হয়। অবশেষে অর্থ লোপাটের চেষ্টায় আংশিক সফল হন। সফটওয়্যারের প্রস্তাব ও ম্যানুয়াল নথির অনুমোদনের পর গত ৯ জুন কবিরের নমিনি আপনের ব্যাংক একাউন্টে ইএফটির মাধ্যমে টাকা প্রেরণ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ইসলামী ব্যাংকের শাখায় পৌনে দুই লাখ টাকা ডিজিটালি ট্রান্সফারও করে পেনশন কর্তৃপক্ষ। পেনশনের অর্থ ফেরত চেয়ে আবেদনের পরও কবির মে এবং জুন মাসের স্কিমের অর্থ পরিশোধের জন্য পেনশন কর্তৃপক্ষের কল সেন্টারে যোগাযোগ করেন। এতেই ধরা পরে যান জালিয়াত কবির। এ প্রেক্ষিতে কবিরের বিরুদ্ধে বিশদ তদন্তের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে পেনশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপক জেবুন নাহার সাক্ষরিত চিঠিতে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত আইজিপিকে অবগত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের লক্ষ্যে রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। ঘটনার বিস্তারিত উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। ব্যাংক একাউন্টে ট্রান্সফারকৃত টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যে তদন্ত কমিটি গত ৩০ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (তহবিল ব্যবস্থাপনা) মুন্সী আব্দুল আহাদের সভাপতিত্বের বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে মুন্সী আব্দুল আহাদ বলেন, তদন্ত কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, প্রতিবেদন এখনও দেওয়া হয়নি।