বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিংয়ের সেবা প্রদান করে সহজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ই-টিকেটিং সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ মূল ডাটাবেজ ও হোস্টিং দেশের বাইরে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের ভার্চ্যুয়াল ক্লাউডে থাকায় রেল যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সকল তথ্যাদি দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে দেশের ই-টিকেটিং সেবা গ্রহণকারী কোটি কোটি রেলযাত্রীর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তথ্যমতে, ই-টিকেটিং সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে টিকেট ক্রয়কারী যে কোনো রেলযাত্রীকে নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল, ভ্রমণ ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের সংবেদনশীল তথ্য প্রদান করতে হয়। এ সকল তথ্য সংরক্ষিত হয় দেশের বাইরে আমাজনের সার্ভারে কিন্তু সহজ ডটকমের সার্ভার দেশের বাইরে থাকায় এই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসকল সংবেদনশীল তথ্য সংবলিত ডাটাবেজ বা সার্ভার হ্যাক বা তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়লে পরিচয় চুরি এমনকি ব্যপক আর্থিক প্রতারণার শিকার হতে পারে রেল যাত্রীরা। এমনকি ভূরাজনৈতিক সংকট বা ক্লাউড সেবাদাতার নীতিমালায় আকস্মিক পরিবর্তন হলে মুহূর্তেই ই-টিকেটিং সেবা বিঘ্নিত হতে পারে।
এমনকি সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের যাতায়াতের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এসব সংবেদনশীল ভ্রমণ রেকর্ড ও লোকেশন কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের বা গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির আওতায় চলে যাওয়ার মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তার ঝুঁকিও প্রকট বলে মহা হিসাব নীরিক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পরিচালিত এক আইটি অডিটে উঠে আসে। বিগত ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর পরিচালিত নীরিক্ষায় রেলওয়ের অনুমোদন ব্যতীত সহজ ডটকমের ইটিকেটিংয়ের সার্ভার বিদেশে স্থাপন করায় তথ্য পাচার ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সহজ ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হক টাইমস টুডেকে বলেন, আমি এখন ব্যাস্ত আছি। বক্তব্য জানতে চাইলে আমাদের জনসংযোগ সংস্থার সাথে কথা বলেন।
সরকারি নীরিক্ষায় নিরাপত্তা ঝুঁকির পেছনে বিভিন্ন কারণও তুলে ধরা হয়েছে। ই-টিকেটিং সেবার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনার জন্য রেলওয়ের সদর দফতরে নিজস্ব বা ডেডিকেটেড কোনো ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হয়নি। রেল ভবনে বর্তমানে ডেটা সেন্টারের মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্ট্রিগেটেড টিকেটিং সিস্টেম (ব্রিটস) সার্ভারের পরিবর্তে শুধু এনআইডি যাচাইকরণের কাজে ব্যবহৃত এনআইডি স্টেজ সার্ভার হোস্ট করা হয়েছে। ফলে মূল ডাটাবেইজ দেশের বাইরে সিঙ্গাপুর অঞ্চলের আমাজনের ক্লাউডে হোস্ট করেছে সহজ নামের প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন গ্রহণ করেনি। বরং রেলওয়ের সাথে যে চুক্তি করেছে সহজ লিমিটেড তা ভঙ্গ করে সরকারের সাথে প্রতারণা করেছে।
আপত্তির জবাবে সহজ ডটকমের পক্ষ থেকে ঈদ ও ছুটির মত সময়ে বিপুল যাত্রীর স্বাভাবিক ট্রাফিক লোড ও লেনদেন নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য ব্রিটসের মত ক্রিটিক্যাল সিস্টেম চালাতে হাইএভেইলেবিলিটি, ইলাস্টিক স্কেলেবিলিটি ও দ্রুত রিমোর্ট রিসোর্সের নিশ্চিত করতে আমাজনকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে। এমনকি এনআইডির তথ্য দেশের বাইরে যাচ্ছে না তবে নাম ও জন্মতারিখের মত বিষয় সার্ভারে সংরক্ষতি হয় বলে স্বীকার করেছে। তবে ক্লাউড কম্পিউটিং নীতিমালা চুক্তিতে উল্লেখ ছিল না তবে ভবিষ্যতে তা সংশোধন করবে বলে অডিট আপত্তির জবাবে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
আপত্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, সহজ ডটকমের সাথে রেলওয়ের চুক্তির টেকনিক্যাল রিকোয়ারম্যান্টস (বি-২) তে বলা হয়েছে, ব্রিটস বা ই-টিকেটিংয়ের জন্য সার্ভার বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব ডাটা সেন্টারে স্থাপন করতে হবে। কিন্তু সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি এসব চুক্তির তোয়াক্কা না করে নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রাউড কম্পিউটিং নীতিমালা ২০২১ এর ৯(ক)তে উল্লেখ রয়েছে, ‘বেসরকারি পর্যায়ে ক্লাউড সেবা গ্রহণকারীর দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের কোনো তথ্য অথবা দেশের নাগরিকের কোনো ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্যাদি যেন দেশের ভৌগলিক সীমানার বাইরে সংরক্ষণ না করা হয় তা নিশ্চিত করা।‘ কিন্তু প্রতিষ্ঠান ই-টিকেটিংয়ের জন্য যাত্রীর দেওয়া এনআইডি নম্বর, নাম, জন্মসনদ, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল আইডি, ভ্রমণ ইতিহাস দেশের বাইরে আমাজন সার্ভারে সংরক্ষণ করছে যা ব্যক্তি আর্থিক তথাপি দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাজন ওয়েব সার্ভিসে সসম্পূর্ণ বিদেশি আইনের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যের আইনের) ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য ও পেমেন্ট গেটওয়ের রেকর্ড সেদেশের কব্জায় রয়েছে। ভূরাজনৈতিক সংকট বা ক্লাউড সেবাদাতার নীতিমালায় আকস্মিক পরিবর্তন হলে মুহূর্তের মধ্যেই ই-টিকেটিং সেবা ধ্বসে পড়বে বলেও আশংকা রয়েছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে এবিষয়ে মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


