দুই বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে দেশটিতে নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নিয়োগকর্তা বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কাছে কর্মীর চাহিদাপত্র পাঠাতে শুরু করেছেন।
একইসাথে মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) লেভি জমা দিয়ে কর্মী অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানানো হয়। একইসাথে আগামী ২০ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এফডব্লিউসিএমএসে রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করতে পারবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র পাওয়ার পর কর্মী বাছাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ পরবর্তী ধাপগুলো কীভাবে এবং কখন সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে এখনো রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা পায়নি। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বলেন, দীর্ঘ সময় পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে এটি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তাই দ্রুত কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সদস্য ফরিদ আহমদ মজুমদার বলেন, নির্ধারিত সময়ে কর্মী পাঠানো না গেলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা অন্য দেশ থেকে কর্মী নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের কোটা বরাদ্দ এবং ই-অ্যাটেস্টেশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলেও পরবর্তী কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো খরচ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। এরই মধ্যে দেশটির নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ১৬টি চাহিদাপত্র পেয়েছে বোয়েসেল।
আগামী ১৬ অক্টোবরের মধ্যে ২০২৪ সালের ৩১ মে আটকেপড়া কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ করার কথা রয়েছে। এরপর এফডব্লিউসিএমএসে নতুন কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করতে পারবে বোয়েসেল।
তবে আটকেপড়া কর্মীদের পাঠানো শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করবে না বলে জানিয়েছে বোয়েসেল। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখনো ১২০ থেকে ১৫০ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ করতে নিয়োগকর্তাদের চিঠি দেওয়া হবে।
বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক বলেন, তাদের প্রথম লক্ষ্য হলো আটকেপড়া কর্মীদের মধ্যে যারা এখনো যেতে পারেননি, তাদের পাঠানো। আগে এই কর্মীদের পাঠানোর কাজ শেষ করতে হবে। ২০ অক্টোবরের পরের বিষয় পরে বিবেচনা করা হবে।
নতুন করে ৮ হাজার কর্মীর চাহিদাপত্র অনুমোদন
কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নতুন করে প্রায় ৮ হাজার চাহিদাপত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত মাসে এফডব্লিউসিএমএসের ই-অ্যাম্বাসি মডিউলে বিভিন্ন নিয়োগকর্তার ২১টি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনে ৮৯৫ কর্মীর চাহিদা সত্যায়নের জন্য দাখিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বর্তমানে ১৭টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। এর বাইরে আরও অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দুই ধাপে মোট ৩১৮টি আবেদন জমা পড়ে। পরে আবেদনকারী মেডিকেল সেন্টারগুলোর প্রোফাইল মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কিছু নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।
এফডব্লিউসিএমএসে ৩৩৮ বাংলাদেশি এজেন্সি
এর আগে গত ২১ আগস্ট ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হলে ‘সিন্ডিকেট’ গঠনের অভিযোগ ওঠে। পরে ২৮ আগস্ট মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএসে ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সরকারের অনুরোধে ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীনে ২৫০টি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সিকে সহযোগী এজেন্সি হিসেবে যুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে সহযোগী এজেন্সির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১২টি।
তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ে বর্তমান সরকারের সরাসরি ভূমিকা নেই। কারণ, এই চুক্তির শর্ত আওয়ামী লীগ সরকারই তৈরি করে গেছে।
একাধিকবার বন্ধ হয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০০৮ সালে বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ আট বছর পরে ২০১৬ সালে আবার চালু হয়েছিল। তবে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।
এরপর ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন করে সমঝোতা চুক্তি সই হলে আবার শ্রমবাজারটি চালু হয়। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বন্ধ ও সংকুচিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরও ছিল মালয়েশিয়ায়। ওই সফরে বাংলাদেশ থেকে আবারও কর্মী নেওয়া শুরু করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।



