দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও দিনের পর দিন গ্যাস না থাকায় রান্নায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, আবার কোথাও গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকার পূর্ব রামপুরার বাসিন্দা হাজেরা খাতুন জানান, গত ১০ বছর ধরে এই এলাকায় থাকলেও রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা সম্পূর্ণ বন্ধ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি এবারই হয়েছেন।
হাজেরা খাতুন জানান, ১৩-১৪দিন একবারেই আসে নাই। ১০ বছর হয় হাজিপাড়া আসছি। এই দুই মাসে সমস্যা একবারে বেশি। আগে সকালে (গ্যাস) যাইতো, আবার দুইটা-আড়াইটার পর আসতো। আবার সন্ধ্যা ছয়টার পরে যাইতো। এখন মোটেই নাই। পাইপলাইনে গ্যাসের সংকটে তার প্রতিবেশীরা কেউ কেউ মাটির চুলাও ব্যবহার করছেন। যাদের সামর্থ্য আছে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রেশনিংয়ের কারণে অনেক স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। সাম্প্রতিক সময়ে একদিনে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ হলো দেশীয় উৎপাদন ক্রমাগত কমে যাওয়া এবং আমদানিনির্ভরতার বিপরীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি।
পেট্রোবাংলার ১১ ও ১২ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। বিপরীতে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে যাওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে সমুদ্রে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তবে দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চললেও দেশের মোট চাহিদা মেটানো কঠিন। নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও সার কারখানাতেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানান, দেশে গ্যাসের উৎপাদন একসময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছিল। এখন তা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও নতুন ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ার তুলনায় পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমেছে বেশি। ফলে সামগ্রিকভাবে প্রতি বছর প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে স্থলভাগ ও সমুদ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় বাংলাদেশকে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হতে হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) জ্বালানি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাজীব হায়দার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। গ্যাস সংকটকে শিল্প খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকলে ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার কথা এমন শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন করতে পারছে না। এতে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, কাঁচামালের খরচ এবং শ্রমিকদের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট অনেক ভালো উদ্যোক্তাকেও ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গ্যাস আমদানি বাড়াতে ২০২৪ সালে সামিট গ্রুপের সঙ্গে তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ওই চুক্তি বাতিল করে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে চুক্তি বাতিল করায় এলএনজি অবকাঠামো তৈরিতে বাংলাদেশ দুই থেকে তিন বছর পিছিয়ে যেতে পারে।
সরকার এখন চীনের সহযোগিতায় নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। তবে এটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- সমুদ্রে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন প্রায় ১৫০টি কূপ খনন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করা।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘দেশীয় উৎপাদন ঘাটতি কারণে গ্যাস আমদানি করতে হবে। আমদানি অবকাঠামো হিসেবে স্থলভাগে এবং সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করতে উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। দেশীয় উৎপাদন এবং আমাদানি দুটি মিলেও গ্যাসের যে চাহিদা আছে প্রায় ১২শ এমএমসিএফ পার ডে, আমাদের গ্যাপ রয়ে গেছে। আপনার কাছে যদি টাকাও থাকে তাও আপনি রাতারাতি এলএনজি ইমপোর্ট বাড়াতে পারবেন না। কারণ আমাদের সে অবকাঠামো নেই।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নেই। সাগরে ভাসমান টার্মিনাল দুটি। সরকার এরই মধ্যে চীনের একটি কোম্পানিকে দিয়ে এফএসআরইউ স্থাপনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এটার বাস্তবায়নেও সময় লাগবে।
সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য এ সরকার দায়ী করা যাবে না। আমাদের সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস এবং আমাদেরকে এইসব জিনিস ইনহেরিট করতে হয়েছে। এখন যেটা আছে এটাও আমরা আশা করি সাকসেসফুলি ওভারকাম করতে পারবো।’

