আমরা প্রতিদিন যে মাছ খাচ্ছি, তার মধ্যে কি লুকিয়ে আছে অদৃশ্য প্লাস্টিকের কণা? সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে- হ্যাঁ, এবং সমস্যাটা শুধু মাছের পেটেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের প্রতিদিনের খাবার যে মাংসপেশি থেকে আসে, সেখানেও।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী
সহজ ভাষায় বললে, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো এক মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে শুরু করে পাঁচ মিলিমিটার পর্যন্ত আকারের প্লাস্টিকের টুকরো। এগুলো দুইভাবে তৈরি হতে পারে। একধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথম থেকেই ছোট আকারে বানানো হয়- যেমন ফেসওয়াশ বা প্রসাধনী সামগ্রীতে ইচ্ছাকৃতভাবে মেশানো ক্ষুদ্র দানা।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বাস্তুতন্ত্র বিভাগের একজন কর্মকর্তার মতে এগুলোকে বলা হয় প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক।

আরেক ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয় বড় প্লাস্টিক পণ্য- যেমন পলিব্যাগ, খাবারের প্যাকেট, পোশাকের তন্তু, গাড়ির টায়ার বা কৃত্রিম ঘাস- ভেঙে ভেঙে ক্ষয় হয়ে। একে বলা হয় সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক, এবং পরিবেশে এর পরিমাণই বেশি।
শুধু ২০২০ সালেই প্রায় ২৭ লাখ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে যুক্ত হয়েছিল বলে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির হিসাব বলছে, আর এই হার এমনভাবে বাড়ছে যে ২০৪০ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আড়িয়ল বিলের দেশি মাছে যা মিলেছে
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একটি গবেষক দল ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ জেলাজুড়ে বিস্তৃত আড়িয়ল বিল নিয়ে কাজ করেছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক- তিন মৌসুম ধরে বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং পাঁচ প্রজাতির প্রায় দেড়শ মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পরীক্ষা করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি- এই পাঁচ ধরনের পরিচিত দেশি মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কই মাছে, যাকে গবেষকরা বলছেন ‘সর্বভুক’ স্বভাবের মাছ- অর্থাৎ যা পাওয়া যায় তা-ই খায়, ফলে দূষিত পরিবেশের কণাও সহজে তার শরীরে ঢুকে পড়ে।
গবেষণা দলের প্রধান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শাহজাহান জানান, শুধু অন্ত্র নয়, মাছগুলোর মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাছের নাড়িভুঁড়ি সাধারণত মানুষ খায় না, কিন্তু মাংসপেশি খাওয়াই মূল উদ্দেশ্য।

ছোট মাছ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কি না, জানতে চাইলে অধ্যাপক শাহজাহান ব্যাখ্যা করেন যে ছোট মাছ প্রায়শই অন্ত্রসহ পুরোটাই খাওয়া হয়, তাই যুক্তির বিচারে সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি থাকার সম্ভাবনা থাকে। তবে কোন প্রজাতিতে ঠিক কতটা বেশি, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন বলেও তিনি জানান।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পানির চেয়ে তলানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি, আর শীত বা শুষ্ক মৌসুমে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের কণা পাওয়া গেছে।
নদী, হাওর থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত সমস্যা
শুধু আড়িয়ল বিল নয়- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দলটি এর আগে ব্রহ্মপুত্র নদ, চলনবিল, হাওরাঞ্চল এবং সমুদ্র উপকূলের মাছ নিয়েও কাজ করেছে, আর প্রতিটি জায়গার মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন অংশ থেকে সংগৃহীত মাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছিল বাইম মাছে। সেই গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল- আকার ও ওজনে বড় মাছের অন্ত্রে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল, আর নদীর ভাটি অঞ্চলের মাছেও এর মাত্রা বেশি ছিল।
চলনবিল ও হাওরাঞ্চল নিয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় জানা যায়, এসব জলাভূমির মাছে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সুতার মতো সরু ও বর্ণহীন মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা, আর প্লাস্টিকের ধরনের মধ্যে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি।

তবে সব জায়গার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল এসেছে সমুদ্র ও শুঁটকি মাছ নিয়ে করা গবেষণায়। কুয়াকাটা ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে তাজা ও শুঁটকি মাছের নমুনা নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাজা মাছের তুলনায় শুঁটকিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
এর কারণ সহজেই অনুমেয়- শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়ায় মাছ দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে শুকানো হয়, ফলে বাতাসে ভাসমান কণাও সহজে জমে যেতে পারে। এই গবেষণায় শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল সুতার মতো ফাইবার আকৃতির প্লাস্টিক।
বুড়িগঙ্গা নদীর প্রসঙ্গও বারবার উঠে আসে এই আলোচনায়। অধ্যাপক শাহজাহান জানান, বুড়িগঙ্গার পানি এমনিতেই ভয়াবহ দূষিত, আর সেই নদীর মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
আড়িয়ল বিলের অবস্থাও ক্রমেই খারাপ হচ্ছে বলে তিনি জানান- বিলটির সবগুলো পানি প্রবাহের সংযোগ চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দূষণ জমে থাকার প্রবণতা বেড়েছে, এবং এই বিষয়ে তারা সরকারি পর্যায়েও অবহিত করেছেন বলে জানা গেছে।
এই কণা মাছের শরীরে কীভাবে ঢোকে
মাছের পাকস্থলীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়াটা আসলে খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাছ পানি থেকে খাবার সংগ্রহ করে- ছোট মাছ, প্ল্যাঙ্কটন, এমনকি তলানির কাদামাটিও তাদের খাদ্যতালিকায় থাকে। এসবের সাথে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাও তাই সহজেই মাছের পরিপাকতন্ত্রে ঢুকে পড়ে।

তবে যেটা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো এসব কণা কখনো কখনো পরিপাকতন্ত্র পেরিয়ে মাংসপেশিতেও পৌঁছে যাচ্ছে বলে প্রমাণ মিলছে। যেহেতু মানুষ মূলত মাছের এই অংশটাই খায়, তাই বিষয়টি খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানবদেহে এর প্রভাব কতটা- নিশ্চিত উত্তর এখনো নেই
মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই যে তা তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে, এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছাননি বিজ্ঞানীরা। অধ্যাপক শাহজাহান স্পষ্ট করে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের সরাসরি ক্ষতি করে- এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তার মতে, মাছের সাথে শরীরে ঢোকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি অংশ মলমূত্রের মাধ্যমে বেরিয়েও যেতে পারে।কিন্তু উদ্বেগের জায়গাটা অন্যত্র।
এই কণাগুলো যদি আরও ভেঙে অতি ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়, তাহলে সেগুলো রক্তপ্রবাহে মিশে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে পৌঁছে যেতে পারে, এমনকি ক্যানসার সৃষ্টিকারী কোষের জন্ম দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে ন্যানোপ্লাস্টিকে রূপান্তর হতে ঠিক কত সময় লাগে, তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। পাশাপাশি এই কণাগুলো ভারী ধাতুসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ বহন করতে পারে বলেও বিষয়টিকে বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করেছেন অধ্যাপক শাহজাহান।
লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের গবেষক স্টেফানি রাইট ২০২৫ সালের শুরুর দিকে করা এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গরম পানিতে প্লাস্টিকের সিলযুক্ত টি-ব্যাগ ডোবানো বা প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার মাইক্রোওয়েভে গরম করার মতো প্রতিদিনকার অভ্যাসও শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি বড় উৎস।
তার ভাষ্যমতে, তাপ ও গরম পানির সংস্পর্শে প্লাস্টিক থেকে কণা নির্গমনের হার সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, একজন সুস্থ মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক ঠিক কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের হাতে এখনো তেমন তথ্য নেই।
শরীরের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার প্রমাণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক গবেষণা মানবদেহের অভ্যন্তরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ইতালির একদল গবেষক হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্যারোটিড ধমনীতে- অর্থাৎ মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান নালিতে- মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন।
বছরের শেষদিকে চীনের একজন গবেষক আবার জয়েন্ট প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করানো রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পান।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের নেতৃত্বে করা এই গবেষণায় একটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে- মৃত্যুর আগে যাদের ডিমেনশিয়া রোগ ধরা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গিয়েছিল।
এটি এখনো সরাসরি কার্যকারণ প্রমাণ করে না, তবে গবেষকদের নতুন করে এই দিকে মনোযোগী করে তুলেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক গবেষণা দেখিয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে পৃথিবীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার মাত্রা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অঞ্চলে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা এখনো অনেকটাই প্রাথমিক পর্যায়ে। কণাগুলো আমাদের চারপাশে, এমনকি খাদ্যচক্রের গভীরেও ঢুকে পড়েছে- এই সত্যটি এখন প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি ঠিক কতটা, কোন মাত্রা বিপজ্জনক, আর কীভাবে এই ঝুঁকি এড়ানো যায়- এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পেতে বিজ্ঞানীদের আরও সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত সচেতনতা আর দায়িত্বশীল প্লাস্টিক ব্যবহারই সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।


