...|...|...

চট্টগ্রাম

দুর্গম পাহাড় থেকে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:৩০ | আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০৩
Shares
দুর্গম পাহাড় থেকে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক

দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নানা প্রতিকূলতা আর সীমিত সুযোগের মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। পুকুরের পানিতে সম্ভাবনার বীজ বুনে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন মাছের খামার। সেই খামার শুধু বদলে দিয়েছে তার নিজের ভাগ্য নয়, তৈরি করেছে কর্মসংস্থান, পূরণ করছে স্থানীয় মানুষের মাছের চাহিদা এবং উৎসাহিত করছে নতুন উদ্যোক্তাদের।

তিনি মো. শাহজাহান। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী ইউনিয়নের এই মৎস্য উদ্যোক্তা এবার পেয়েছেন জাতীয় স্বীকৃতি। মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় মৎস্য পদক-২০২৬-এর ‘মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ ক্যাটাগরিতে অর্জন করেছেন স্বর্ণপদক।

সম্প্রতি সময়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর কেন্দ্রীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাহজাহানের হাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুলে দেন স্বর্ণপদক, সনদ ও ৫০ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার।

তবে এই স্বর্ণপদকের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের পরিশ্রমের গল্প। ১৯৮৮ সাল থেকে মাছের পোনা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শাহজাহান। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি শুধু দীঘিনালা নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মৎস্যচাষিদের পোনার চাহিদা পূরণ করে আসছেন।

তার খামারে এখন স্থায়ীভাবে কাজ করছেন ছয়জন। মৌসুমি বা অস্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ১২ জনের। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার উদ্যোগে সরাসরি জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়েছে অন্তত ১৮ জনের।

২০২৫ সালের হিসাবও তার সফলতার চিত্র স্পষ্ট করে। জাতীয় মৎস্য পদকের সনদ অনুযায়ী, ছয়টি পুকুরে মোট ৩ দশমিক ২ হেক্টর জলায়তনে ১২ মেট্রিক টন কার্পজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন করেন তিনি। পাশাপাশি ১ দশমিক ২১ হেক্টর জলাশয়ে তেলাপিয়া ও কার্পের মিশ্রচাষ করে উৎপাদন করেন ২৮ দশমিক ৮ মেট্রিক টন মাছ।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর সফলতার কারণে শাহজাহান এখন শুধু একজন মাছচাষি নন; স্থানীয় অনেকের কাছে তিনি একজন পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণার নাম। তার অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতায় এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন মাছের খামার। তার সফলতা দেখে অনেকেই মাছচাষে আগ্রহী হয়েছেন।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, ‘শাহজাহানের এই অর্জনে উপজেলা প্রশাসন গর্বিত ও আনন্দিত। তিনি এলাকায় ফিরে এলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার মতে, শাহজাহানের সাফল্য দীঘিনালার অন্য মৎস্যচাষি ও নতুন উদ্যোক্তাদের মাছচাষে আরও উৎসাহিত করবে।’

স্থানীয়রা বলেন,‘ শাহজাহানের জাতীয় পর্যায়ে এই অর্জন পুরো দীঘিনালাবাসীর জন্য গর্বের। তার স্বর্ণপদকের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে দীঘিনালার পরিচিতিও আরও উজ্জ্বল হয়েছে।’

শাহজাহানের এই অর্জনে আনন্দিত তার পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মৎস্যচাষিরাও। তাদের কাছে এই স্বর্ণপদক শুধু একজন সফল মাছচাষির ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি দুর্গম দীঘিনালার মৎস্যখাতের সম্ভাবনারও স্বীকৃতি।

দীর্ঘ ৩৮ বছরের পরিশ্রমে শাহজাহান দেখিয়েছেন—সুযোগ সীমিত হলেও উদ্যোগ, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রম থাকলে দুর্গম পাহাড়েও গড়ে তোলা যায় সফলতার গল্প। নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্যদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ দেখিয়ে সেই গল্পই এবার পৌঁছে গেছে জাতীয় মঞ্চে।
আর সেই গল্পের স্বীকৃতি হয়ে তার হাতে উঠেছে জাতীয় মৎস্য স্বর্ণপদক-২০২৬।