বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় দীপের কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে তাহসিফের সাথে তার যোগাযোগ, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার কারণ এবং সেখান থেকে একা ফিরে আসার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। তবে শুনানি শেষে ঢাকার একটি আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন।
দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাটির বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তাহসিফের লাশের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনকে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে এবং পরবর্তী সময়ে করা কলসহ ফোনের বিভিন্ন তথ্যের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করছে দুটি সংস্থা। তদন্তকারীদের ধারণা, মোবাইল ফোনের তথ্য থেকে মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া তাহসিফকে সর্বশেষ যেসব এলাকায় দেখা গেছে, সেসব স্থানে তার যাতায়াত এবং কোনো ধাওয়া বা অন্য ঘটনার মুখে পড়েছিলেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং যেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই এলাকাগুলো ঢাকার মাদক ব্যবসার হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, তাহসিফ এত রাতে সেখানে কেন গিয়েছিলেন, এর আগে ওই এলাকায় তার যাতায়াত ছিল কি না, থাকলে কার সঙ্গে যোগাযোগ হতো এবং নিখোঁজ হওয়ার রাতে তিনি ও দীপ সেখানে কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এসব প্রশ্নের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও বিশ্লেষণ করছেন তারা।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ফুটেজে তাহসিফকে দীপের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যেতে দেখা গেছে। তবে সেখান থেকে দুজনকে একসঙ্গে ফিরতে দেখা যায়নি। বরং একটি ভিডিওতে দীপকে একাই মোটরসাইকেল চালিয়ে ওই এলাকা থেকে ফিরে আসতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া মাজার বস্তিতে যাওয়ার আগে উত্তরা এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা যাওয়ার একটি ফুটেজও ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ফুটেজের সত্যতা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। সেখানে দীপের উপস্থিতি এবং ওই তরুণীর পরিচয় ও তাহসিফের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। রিমান্ডে দীপকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার আশা করছেন কর্মকর্তারা।
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হওয়ায় তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনাটিকে স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছে সরকার। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের বিষয়ে সরকারের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। এদিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব দাবি ছড়িয়েছে, সেগুলো সত্য নয় বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ সাউরি। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজারবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। পরে পুলিশ তার বাবাকে বিষয়টি জানায়। তাহসিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও দাবি সামনে আসে।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় হেলিকপ্টারে ওঠার ভিডিও তাহসিফ ধারণ বা প্রচার করেছিলেন বলে দাবি ছড়ায়। তবে কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে তাহসিফ নিজেই এমন দাবি অস্বীকার করেছিলেন।
এদিকে দীপের প্রাথমিক বক্তব্যে তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার যে তথ্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “পুলিশ ধাওয়া দিলে একজন কমিশন্ড অফিসার দৌড় দেবে এটাই তো হাস্যকর কথা। প্রশ্নই আসে না। ধাওয়াই বা দেবে কেন, আর সে দৌঁড়াবেই বা কেন। বোগাস কথাবার্তা। একজন কমিশন্ড অফিসার যে কোনো স্টেজে চমৎকারভাবে ফেস করার মতো সাহসিকতা মানসিকতা সবকিছুই রাখে”।
শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন তাহসিফের বাবা। ওই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখানোর কথা জানিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে শনিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হলে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
তাহসিফের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের সঙ্গে তার ছেলের বেশ কিছুদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন, “দীপের সাথে আমার ছেলের বেশ কিছুদিন ধরে সম্পর্ক। আসা যাওয়া করতো। খাওয়া দাওয়া করতো। তার ছোটো ভাইয়ের মতো। সেই ডেকে নিয়ে গেছে”।
কে এম এনায়েতুল করিম আরও জানান, পিবিআইয়ের তদন্তসংক্রান্ত যেসব তথ্য তিনি দেখেছেন, তাতে দীপ তার ছেলের সঙ্গে টঙ্গীতে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও তাকে আগে ভিন্ন কথা বলেছিলেন। তার ভাষায়, “দীপ আমাকে বলেছিল সে আমার ছেলেকে কম্পাউন্ডে রেখে গেছে। বিষয়গুলো আসলে প্রশ্নবিদ্ধ। আমি জানি না কে জড়িত বা কে কী করেছে। আমি বুঝতে পারছি না,”।
তাহসিফের বাবা জানান, ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তিনি উত্তরখান থানায় আবেদন করেছেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টার দিকে দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত বাড়লেও তিনি বাসায় না ফেরায় তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করেন। তখন তাহসিফ কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসার কথা জানান।
এজাহারে আরও বলা হয়, রাত ১টা ৩ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে মেসেঞ্জারে তার মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিসি আসতেছি’। কিন্তু রাত পেরিয়ে পরদিন বিকেল হলেও তিনি বাসায় ফেরেননি। পরে ২৮ অক্টোবর নৌ-পুলিশ ফোন করে তার বাবাকে জানায়, উত্তরখানের রাজারবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে নৌ-পুলিশ পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে।
লাশ উদ্ধারের পর তৈরি করা সুরতহাল প্রতিবেদনে তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ এ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্ত চলমান থাকায় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে তুরাগ নদের যে এলাকা থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে পরিদর্শন করেছেন পিবিআইয়ের তদন্তকারী দল। পাশাপাশি দীপকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি স্থানেও গেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, এসব তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা চলছে।



