দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম শহরের পূর্ব দিকের একটি এলাকা থেকে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে নবম এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে নারী নির্যাতন ও নারী হত্যা বা ফেমিসাইডের ঘটনা এমনিতেই আশঙ্কাজনক হারে বেশি থাকায়, এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড স্থানীয় নারীদের মনে চরম আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে জোহানেসবার্গের একটি অঞ্চল একুরহুলেনির ডন পার্ক থেকে সর্বশেষ লাশটি উদ্ধার করা হয়। বেশ কয়েকটি ঘটনার মধ্যে মিল থাকলেও, এই নয়টি মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না বা এর পেছনে কোনো সিরিয়াল কিলার বা ধারাবাহিক খুনি জড়িত আছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।
নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা দক্ষিণ আফ্রিকার অলাভজনক সংস্থা ‘উমেন ফর চেঞ্জ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা ওয়াল্টার সিএনএনকে বলেন, মহিলারা অত্যন্ত আতঙ্কিত।
তিনি আরও বলেন, বেঁচে থাকার জন্য এখানকার নারীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের জীবনযাত্রার ধরন বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। একুরহুলেনিতে যা ঘটছে তা সেই ভয়কে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেছেন যে এই হত্যাকাণ্ডগুলো মানুষের মনে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তিনি পুলিশকে এই মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে কোনো কূল কিনারা বাদ না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনার জেরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডগুলোর কি কোনো যোগসূত্র আছে?
দক্ষিণ আফ্রিকায় এর আগেও নারীদের ওপর চালানো ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়েছে দেশটি। ১৯৯০-এর দশকে গৌতঙে একদল হত্যাকাণ্ডের পর মোসেস সিতহোলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যার হামলায় অন্তত ৩৭ জন নারী ও এক শিশু নিহত হয়েছিল। এর মধ্যে জোহানেসবার্গের পূর্বে অবস্থিত ক্লিভল্যান্ডে ১৫ জন নারীর দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল।
তদন্তকারীরা কী ঘটেছিল তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, কেম্পটন পার্ক এবং এর আশেপাশের এলাকায়—যেখানে বেশ কয়েকটি লাশ পাওয়া গেছে—নারীদের একা দৌড়ানো বা বিচ্ছিন্ন এলাকায় হাঁটা থেকে বিরত থাকার এবং সম্ভব হলে দলবদ্ধভাবে বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পুলিশের দাবি, তদন্ত চলাকালীন এটি একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ এবং এর উদ্দেশ্য নারীদের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া নয়। তবে এই সতর্কবার্তা এমন নারীদের ক্ষুব্ধ করেছে যারা বলছেন যে নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা ইতোমধ্যেই তাদের জীবনযাত্রার ধরন বদলে ফেলেছেন। সাবরিনা ওয়াল্টার বলেন, মহিলারা সবসময় নিজেদের সতর্ক রাখার কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আমরা ইতোমধ্যেই যথেষ্ট সতর্ক আছি।
ফাইন্যান্স ম্যানেজার লেবোগাং গারি তাদেরই একজন, যারা নিজেদের দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। নিহত নারীদের মধ্যে ৩৮ বছর বয়সি এলিজাবেথ টসন্টসো মোসেলাকগামো চলতি মাসের শুরুতে দৌড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। কয়েক দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। লেবোগাং গারি নিহত মোসেলাকগামোকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না, তবে এমন অনেক রানারকে তিনি চেনেন যারা তাকে চিনতেন। তিনি বলেন, এই মৃত্যুটি এই ভীতিকর হত্যাকাণ্ডগুলোকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
গারি সিএনএনকে বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো আমাকে নিরাপত্তাহীন, উদ্বিগ্ন এবং আমার স্বাভাবিক রুটিন অনুযায়ী দৌড়াতে যাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত করে তুলেছে।
তিনি জানান, দৌড়ানোর বিষয়টি এখন বরং একটি উদ্বেগজনক বা ট্রিগারিং বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে গারি তার বসবাসের গেটেড এস্টেটের মধ্যেই দৌড়ানো সীমিত রেখেছেন এবং মাঝে মাঝে সময় কমিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, তার সকালের কাজ এবং সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করার ব্যস্ততার কারণে অন্য মানুষের সাথে একসঙ্গে দৌড়ানো সবসময় বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে না।
একটি বৃহত্তর ফেমিসাইড বা নারী হত্যা সংকট
দক্ষিণ আফ্রিকান মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের শীর্ষস্থানীয় ফেমিসাইড গবেষক নাঈমাহ আব্রাহামের মতে, একুরহুলেনির এই ঘটনাগুলো এমন একটি সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসছে যা প্রায়ই কম প্রচার পেয়ে সারা দেশেই ঘটে চলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকান মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের একটি জাতীয় গবেষণায় অনুমান করা হয়েছিল যে, ২০২০/২১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাতজন নারী নিহত হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে নিহতদের ৬০ শতাংশই অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে খুন হয়েছেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্তরঙ্গ সঙ্গী কর্তৃক নারী হত্যার হার বৈশ্বিক হারের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি।
আব্রাহাম সিএনএনকে বলেন, এটি আমাদের এটাই বলে যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফেমিসাইড বা নারী হত্যা কমছে না বললেই চলে। আমাদের কাছে যেসব হস্তক্ষেপমূলক ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো কার্যকর নয় অথবা অপর্যাপ্ত। তিনি বলেন, কেবল যেসব মামলা কোনো ক্লাস্টার বা গুচ্ছের অংশ হয়ে ওঠে সেগুলোরই নয়, বরং নারীদের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেরই একটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত হওয়া উচিত। যখন দ্বিতীয় কোনো লাশ পাওয়া যায়, তখনই এটিকে রেড ফ্ল্যাগ বা বিপদের সংকেত হিসেবে ধরতে হবে, উল্লেখ করে আব্রাহাম এই ধরনের মামলাগুলো পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত তদন্তকারী নিয়োগের আহ্বান জানান।
তবে আব্রাহামের মতে, সহিংসতা প্রতিরোধের দায়িত্ব নারীদের ওপর বর্তানো উচিত নয় যাতে তারা নিজেদের জীবনযাত্রা বদলাতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, নিজেদের সুরক্ষার জন্য সবসময় নারীদের তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে বলাটা অত্যন্ত অন্যায়। পুরুষদের আচরণই পরিবর্তন করতে হবে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ফেমিসাইডকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে, যার জন্য একটি সমন্বিত সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। তবে আন্দোলনকর্মী ও গবেষকদের মতে, এই ঘোষণাটিকে এখন অবশ্যই কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। ওয়াল্টার বলেন, সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ইতোমধ্যেই আইন ও নীতিমালা রয়েছে, তবে সেগুলোকে বাস্তবে রূপায়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মহিলারা কেবল ঘোষণার ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে পারে না। আমাদের বাজেট দরকার। আমাদের বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের কার্যকর প্রতিষ্ঠান দরকার। আমাদের প্রতিরোধ দরকার। আমাদের জবাবদিহিতা দরকার।
গারির মতো নারীদের কাছে এই ভয় সকালবেলা দৌড়াতে যাওয়ার মতো সাধারণ একটি অভ্যাসেও পরিবর্তন এনেছে। কিছু দিন তিনি রানিং জুতো পায়ে গলিয়েও বাড়ির বাইরে যাওয়ার সাহস পান না। তিনি বলেন, জিমের ট্রেডমিলটি… অনেক বেশি নিরাপদ।


