থাইরয়েড গলার নিচের অংশে অবস্থিত একটি ছোট, প্রজাপতির আকৃতির গ্রন্থি, কিন্তু এর প্রভাব শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের উপর পড়ে। মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রন্থি রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন ও ওজন নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন তৈরি করে।
থাইরয়েড ঠিকমতো কাজ না করলে দুই ধরনের সমস্যা হতে পারে- হাইপোথাইরয়েডিজম (কম হরমোন উৎপাদন) এবং হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদন)।
আমেরিকান থাইরয়েড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি আটজন নারীর মধ্যে একজন তার জীবদ্দশায় কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হন।
সমস্যা হলো, এই লক্ষণগুলো প্রায়ই মানসিক চাপ, বার্ধক্য বা অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষত হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে দেখা দেয় বলে অনেকেই তা অবহেলা করেন।
নিচে বিশ্বস্ত চিকিৎসা সূত্রের ভিত্তিতে থাইরয়েড সমস্যার প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. অস্বাভাবিক ওজন পরিবর্তন
থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) নিয়ন্ত্রণ করে। ফায়ারল্যান্ডস হেলথ সিস্টেমের চিকিৎসা তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম সত্ত্বেও হাইপোথাইরয়েডিজম অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে,
কারণ এতে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। অন্যদিকে, স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় থাকলেও হাইপারথাইরয়েডিজম ব্যাখ্যাতীত ওজন হ্রাসের কারণ হতে পারে।
২. ক্রমাগত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
মায়ো ক্লিনিকের তথ্যানুযায়ী, হাইপোথাইরয়েডিজমের সাথে ক্লান্তি ও পেশির দুর্বলতা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত- পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও এই ক্লান্তিভাব কাটে না।
এই লক্ষণ প্রায়ই মানসিক চাপ বা ঘুমের অভাবের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, তাই অন্যান্য উপসর্গের সাথে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৩. তাপমাত্রার প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা
মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী, ঠান্ডা বা গরমের প্রতি বাড়তি সংবেদনশীলতা থাইরয়েড রোগের একটি সাধারণ লক্ষণ।
হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্তরা সাধারণত ঠান্ডায় বেশি কষ্ট পান, আর হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্তরা অতিরিক্ত ঘাম ও গরম অনুভব করেন, এমনকি স্বাভাবিক তাপমাত্রায়ও।
৪. হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন
মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, হাইপারথাইরয়েডিজম দ্রুত হৃদস্পন্দন, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও কাঁপুনির কারণ হতে পারে, আর হাইপোথাইরয়েডিজম হৃদস্পন্দন ধীর করে দিতে পারে।
ঘন ঘন বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ চিকিৎসা না করালে হৃৎযন্ত্রের জটিলতা (যেমন অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন) দেখা দিতে পারে বলে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানিয়েছে
৫. চুল পাতলা হওয়া ও ত্বকের শুষ্কতা
ফায়ারল্যান্ডস হেলথ সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, হাইপোথাইরয়েডিজম ত্বক ও চুল শুষ্ক এবং ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও একই ধরনের তথ্য দিয়ে জানিয়েছে যে, হাইপোথাইরয়েডিজমের সাথে চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে।
৬. হজম প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন
মায়ো ক্লিনিক নিউজ নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে গেলে হাইপোথাইরয়েডিজমে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।
বিপরীতে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ডকুমেন্টেশনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী হাইপারথাইরয়েডিজমে হজম প্রক্রিয়া দ্রুত হয়ে যাওয়ায় ঘন ঘন মলত্যাগের প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
৭. মেজাজ ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন
মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী হাইপোথাইরয়েডিজমের সাথে বিষণ্নতা ও অস্বাভাবিক ক্লান্তির সম্পর্ক থাকতে পারে, আর হাইপারথাইরয়েডিজমের সাথে উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ যুক্ত থাকতে পারে।
একটি উল্লেখযোগ্য কেস স্টাডিতে (PMC-প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল) দেখা গেছে, এক রোগীর হাইপারথাইরয়েডিজমকে প্রাথমিকভাবে সাধারণ উদ্বেগজনিত সমস্যা (জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার) বলে ভুল নির্ণয় করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে থাইরয়েডের কারণে সৃষ্ট মানসিক লক্ষণ কতটা প্রতারণাপূর্ণ হতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক পরিবর্তনের সাথে শারীরিক লক্ষণও দেখা দিলে থাইরয়েড পরীক্ষা করানো উচিত।
৮. মাসিক চক্রে অনিয়ম
মায়ো ক্লিনিক নিউজ নেটওয়ার্ক অনুযায়ী, হাইপারথাইরয়েডিজম মাসিক চক্রে পরিবর্তন আনতে পারে, এবং থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা প্রজনন স্বাস্থ্যের সাথেও সম্পর্কযুক্ত।
৯. কণ্ঠস্বর ও গলায় পরিবর্তন
মায়ো ক্লিনিক নিউজ নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হাইপোথাইরয়েডিজমে কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া এবং পেশির দুর্বলতার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
এছাড়া, থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে গিয়ে গলগন্ড (গয়টার) তৈরি হলে গলায় ফোলাভাব বা চাপ অনুভূত হতে পারে, যা মায়ো ক্লিনিক প্রসিডিংসে প্রকাশিত একটি ক্লিনিক্যাল পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন এই লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা না করালে হাইপারথাইরয়েডিজম থেকে হৃদযন্ত্রের জটিলতা ও অস্টিওপোরোসিসের মতো সমস্যা হতে পারে, আর চিকিৎসা না করানো হাইপোথাইরয়েডিজম থেকে বিষণ্নতা, স্নায়ুজনিত সমস্যা এবং বিরল ক্ষেত্রে জীবনঘাতী জটিলতা (মিক্সিডেমা কোমা) পর্যন্ত হতে পারে।
খুশির বিষয় হলো, উভয় অবস্থাই সাধারণত সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় এবং ওষুধের মাধ্যমে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কী করবেন?
উপরের একাধিক লক্ষণ যদি একসাথে এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে দেখা দেয়, তাহলে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TSH, T3, T4) সাধারণত একটি সহজ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই করা যায়, যা নির্ণয়ের প্রথম ধাপ।
মনে রাখা জরুরি, এই লক্ষণগুলোর প্রতিটিরই অন্য অনেক সাধারণ কারণ থাকতে পারে- তাই শুধু একটি বা দুটি লক্ষণের ভিত্তিতে নিজে নিজে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
তথ্যসূত্র:
- Mayo Clinic Health System - Thyroid disease diminishes quality of life
- Firelands Health System - Signs of thyroid conditions
- American Thyroid Association
- PMC (National Library of Medicine) - Hyperthyroidism Masquerading as an Anxiety Disorder: A Case Report



