...|...|...

বিশ্ব

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে ইরান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:২৩ | আপডেট: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৩৪
Shares
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে ইরান

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা এক গোপন ছায়া অর্থনীতি ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকে রয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত থামাতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বা অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার অভিযান শুরু করলেও ইরান তা সফলভাবে মোকাবিলা করে চলেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, ওয়াশিংটন বিশ্বনেতাদের ইরানের সাথে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য সতর্ক করেছে এবং যারা তা করবে তাদের মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। একই সাথে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি করে দেশটির প্রধান আর্থিক জীবনরেখা স্তব্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তেহরান এমন এক জটিল তেল বিক্রি ও গোপন ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা এই অর্থনৈতিক আক্রমণকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিহত করতে সক্ষম বলে আশা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে ইরান যেভাবে নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখছে, তার প্রধান উপায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মার্কিন অবরোধের বাইরে ইরানি তেল ও ইচ্ছুক ক্রেতা

 ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির প্রধান আয়ের উৎস তেল রফতানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবে তেহরানের হাতে এখনও সাগরের বুকে ট্যাংকারে সংরক্ষিত রয়েছে কোটি কোটি ব্যারেল তেল, যার বেশিরভাগই মালয়েশিয়ার জলসীমায় ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ডেটা ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের তেল রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি কেনে চীন। মার্কিন অবরোধের কারণে সরবরাহ সীমিত হলেও চীন গত আগস্ট মাসে প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল আমদানি করেছে।

এই সরবরাহের মূলে রয়েছে একটি জটিল ‘শিপ-টু-শিপ’ বা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থা। মালয়েশিয়ার উপকূলের আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ট্যাংকারগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল অন্য জাহাজে খালাস করা হয়, যাতে জ্বালানির আসল উৎস গোপন থাকে। এরপর সেই ট্যাংকারগুলো চীনে কার্গো নিয়ে যায়, যেখানে এটিকে অ-ইরানি আমদান হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। শিপ-ট্রেকিং কোম্পানি ভোর্টেক্সার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে এশিয়ার জলসীমায় ইরানের প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ক্রুড অয়েল ভাসমান গুদামে মজুত রয়েছে, যার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।

২. চীনা মুদ্রা ইউয়ানের আর্থিক জালের ব্যবহার

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো লক্ষ্যবস্তুগুলোকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে দেওয়া এবং তাদের সাথে ব্যবসা করার সাহস দেখানো কোম্পানিগুলোকে হুমকি দেওয়া। তবে মার্কিন শত্রু দেশগুলো যদি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা এবং ডলার এড়িয়ে চলতে পারে, তবে এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।

চীনই ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। চলতি গ্রীষ্মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সময়ও ইরান ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল বিক্রি করেছে এবং এসব লেনদেন ক্রমবর্ধমানভাবে চীনা ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে। ইরান এরপর চীন থেকে পণ্য ও সেবা কিনে নেয় কিংবা চীনা কোম্পানিগুলোকে ইরানের অভ্যন্তরে অবকাঠামো নির্মাণের বিনিময়ে তেল দেয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের নজরদারির বাইরে থাকা এই লেনদেনগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।

৩. মার্কিন নজরদারি এড়াতে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ডলারের মতো প্রচলিত মুদ্রায় ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ায় দেশটির ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকদের মতে, বাণিজ্য পরিচালনা এবং অস্ত্র ও পণ্য আমদানির জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে। এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস তেল বিক্রির অর্থ পেতে—বিশেষ করে চীনা ক্রেতাদের কাছ থেকে—ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করেছে।

এর জবাবে ওয়াশিংটন ইরানের ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং দেশটির এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ডিজিটাল মুদ্রা জব্দ করেছে। এর ফলে ক্রিপ্টো চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ সরানো ইরানের জন্য আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন, কারণ এই খাতের বড় একটি অংশ অনিয়ন্ত্রিত এবং লেনদেনগুলো বেনামে করা যায়। গবেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা পাওয়া ইরানি ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল একটি বড় নেটওয়ার্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ মাত্র।

৪. শেল কোম্পানির মাধ্যমে ডলারের নাগাল

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, পণ্য ও অস্ত্র কিনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো মিত্রদের কাছে অর্থ পাঠাতে ইরানেরএখনও মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য মুদ্রার প্রয়োজন হয়। তেহরান হংকং এবং দুবাইয়ের মতো বড় বড় আর্থিক কেন্দ্রে ইরানি এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত শেল কোম্পানির একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এই কোম্পানিগুলো ইরানি তেলের আয় এবং অন্যান্য রফতানি লভ্যতার অর্থ ডলার, ইউরো এবং আমিরাতি দিরহামে রূপান্তর করে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থার সাথে জড়িত কোম্পানি ও ব্যক্তিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ব্যবহার করেছে। তবে এটি অনেকটা ‘হ্যাক-এ-মোল’ বা ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো। ওয়াশিংটন একটি ফ্রন্ট কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করার সাথে সাথে তেহরান নতুন আরেকটি কোম্পানি খুলে বসে। এমনকি অনেক দেশও ইরানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক।

৫. অস্ত্র তৈরিতে ছায়া নেটওয়ার্কের ব্যবহার

ইরানের এই ছায়া ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটি ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং অন্যান্য অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছে। এই উপকরণগুলোর বড় অংশই আসে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে, যারা অনেক সময় প্রকৃত ক্রেতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে না। এমনকি চীনা কোম্পানিগুলো কাঁচামাল ইরানে সরবরাহ করা হচ্ছে তা জানলেও, এই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে খুব একটা পরোয়া করে না অথবা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে আগেই বিচ্ছিন্ন থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, ইরানের ‘শাহিদ’ আক্রমণাত্মক ড্রোনে চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা মার্কিন মিত্রদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে এবং আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।