ইসলামে জুমার দিনটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত জুমার সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই শুধু জুমার নামাজ আদায়ের মধ্যেই এ দিনের আমল সীমাবদ্ধ নয়। জুমার রাত ও দিনে বিভিন্ন নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
জুমার রাত ও দিনে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আমল তুলে ধরা হলো—
১. ইবাদতে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া
আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ইবাদতের জন্য জুমার দিনকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন। তাই এ দিনে অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি ইবাদত করার চেষ্টা করা উচিত।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমরা পৃথিবীতে সর্বশেষ আগমনকারীরাই কিয়ামতের দিন অগ্রবর্তী থাকব। তবে পার্থক্য হলো, তাদের আমাদের আগে আল্লাহর কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের তা দেওয়া হয়েছে তাদের পরে। এরপর তাদের ইবাদতের জন্য এ দিনটি অর্থাৎ জুমার দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এ দিন নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের এ বিষয়ে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। ইহুদিরা পরের দিন শনিবার এবং খ্রিস্টানরা তার পরের দিন রবিবারকে গ্রহণ করেছে। (বুখারি, হাদিস: ৮৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০১৫)
২. মাগরিব ও এশার নামাজে নির্দিষ্ট সুরা পড়া
জুমার রাতে মাগরিবের নামাজে সুরা কাফিরুন ও সুরা ইখলাস এবং এশার নামাজে সুরা জুমা ও সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াতের কথা হাদিসে পাওয়া যায়।
জাবির ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার রাতে মাগরিবের নামাজে সুরা ‘কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন’ ও ‘কুলহু আল্লাহু আহাদ’ পড়তেন। আর এশার নামাজে সুরা জুমা ও সুরা মুনাফিকুন তিলাওয়াত করতেন। (আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ৫৯৪০; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ১৮৪১)
৩. জুমার রাতে সুরা দুখান পাঠ
জুমার রাতে সুরা দুখান তিলাওয়াত করাও একটি আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার রাতে সুরা দুখান তিলাওয়াত করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি, হাদিস: ২৮৮৯)
৪. ফজরের নামাজে সুরা সিজদা ও সুরা দাহর
জুমার দিনের ফজরের ফরজ নামাজের প্রথম রাকাতে সুরা সিজদা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা দাহর তিলাওয়াত করা সুন্নত আমল।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের ফজরের নামাজের প্রথম রাকাতে ‘আলিফ লাম মিম তানজিল’ অর্থাৎ সুরা সিজদা এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘হাল আতা আলাল ইনসানি হি-নুম মিনাদ দাহরি লাম ইয়াকুন শাইয়াম মাযকুরা’ অর্থাৎ সুরা আদ-দাহর তিলাওয়াত করতেন। (বুখারি, হাদিস: ৮৫১; মুসলিম, হাদিস: ২০৭২)
৫. সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা
জুমার দিনের অন্যতম আমল হলো সুরা কাহফ পাঠ করা।
আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় বিশেষ আলো দ্বারা আলোকিত থাকবে। (সুনানুল-বায়হাকি আল-কুবরা, হাদিস: ৫৭৯২)
৬. কিয়ামতের কথা স্মরণ করা
জুমার দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে। তাই এ দিনে কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণ করে আল্লাহর প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।
আবু লুবাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) জুমার প্রসঙ্গে বলেন, জুমার দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে। প্রত্যেক সম্মানিত ফেরেশতা, আকাশ, জমিন, বাতাস, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র—সবকিছুই জুমার দিন ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। (ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪)
৭. বেশি বেশি দরুদ পাঠ
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা উত্তম আমল।
আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন তোমরা আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কেননা এটি উপস্থিতির দিন। এদিনে ফেরেশতারা (আল্লাহর বিশেষ রহমত নিয়ে) উপস্থিত হয়। তোমাদের যে কেউই আমার প্রতি দরুদ পাঠ করে, তার দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত সে দরুদ থেকে অবসর না হয়।’
বর্ণনাকারী জানতে চাইলেন, মৃত্যুর পরও কি দরুদ তার কাছে পেশ করা হবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মৃত্যুর পরও দরুদ তার কাছে পেশ করা হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা নবীদের দেহ ভক্ষণ করা মাটির প্রতি হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর নবী সর্বদাই জীবিত, তাকে রিজিক দেওয়া হয়। (ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১৬৩৭)
৮. সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা
জুমার দিনে সাধ্যমতো দান-সদকা করা উচিত। এ দিনের দান-সদকার বিশেষ ফজিলত রয়েছে বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।
কা’ব (রা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের জুমার দিন সম্পর্কে বলব না? জুমার দিন দান-সদকা করা অন্যান্য দিনে দান-সদকা করার চেয়ে অতি উত্তম।’ [জাদুল মায়াদ ফি হাদয়ি খায়রিল ইবাদ (বৈরুত: মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৫ হি., ১৯৯৪ খ্রি.), পৃষ্ঠা-৪১২]
৯. মৃত পিতা-মাতার কবর জিয়ারত
পিতা-মাতা ইন্তেকাল করলে তাঁদের কবর জিয়ারত করা উত্তম আমল। বিশেষ করে জুমার দিনে তাঁদের কবর জিয়ারত করার ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে।
মুহাম্মদ ইবনে নুমান মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক জুমার দিন তার পিতা-মাতা অথবা তাদের কোনো একজনের কবর জিয়ারত করে, তাকে ক্ষমা করা হয় এবং সে পিতা-মাতার আনুগত্যশীল হিসেবে গণ্য হয়। (শুআবুল ঈমান, হাদিস: ৭৯০১)
১০. আসরের পর মাগরিব পর্যন্ত দোয়া
জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। এ সময়টি কখন—এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টি এ বিশেষ সময়ের অন্তর্ভুক্ত। (দ্র. তিরমিজি, হাদিস: ৪৮৯)
সূর্যাস্তের সাথে জুমার দিনের সমাপ্তি ঘটে। তাই দিনের শেষ সময়ে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান নামাজরত অবস্থায় সে সময়টি পেলে আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করেন। এরপর তিনি হাতের ইশারায় সময়টির স্বল্পতার কথা বোঝান। (বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)
তাই জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিবের নামাজের অপেক্ষায় থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও কল্যাণের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা যেতে পারে। এতে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়টি পাওয়ার আশা থাকে।


