চট্টগ্রাম নগরীর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গত এক দশকে অন্তত ২০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক)। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। ফলে উদ্যোগটি থমকে যায়। অন্য প্রস্তাবগুলোরও কোনোটি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় বাস্তবায়িত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর নগরীর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)।
এতে নতুন করে আশার সঞ্চার হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, নীতিগত অনুমোদন পাওয়া যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামে এখনো কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি করেনি। এমনকি চসিকের সাথেও তাদের কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়নি।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, গেল বছরের ১৭ মার্চ চসিক মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাজ্যের ‘ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড’ ও ‘ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল লিমিটেড’-এর প্রতিনিধি দল যৌথ উদ্যোগে পিপিপির ভিত্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করে। তারা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে বর্জ্য থেকে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়।
সর্বশেষ চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই পিপিপির ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, ডিপি ক্লিন টেক ইউকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গেছে। পিপিপি অথরিটির সাথে চুক্তি হওয়ার পর তারা একটা কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে করবে।
প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বর্জ্যের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন ১ হাজার ৬শ থেকে ২ হাজার টন বর্জ্য লাগবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে ৩৬ একর জায়গা।
অন্যদিকে জাপানের প্রতিষ্ঠান ‘জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’ ২০২২ সালে চসিকের কাছে ‘ইন্টিগ্রেটেড ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ও ‘ইয়াচিও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’ সমীক্ষা চালায়।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সাথে সাক্ষাৎ করে জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের প্রতিনিধি দল দ্বিতীয় ধাপের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার কথা জানায়। সমীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তবে এখনো প্রকল্পটির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
জেএফইর সমীক্ষা অনুযায়ী, নগরীতে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্য থেকে ১ হাজার টন ব্যবহার করে ১৫ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহযোগ্য বিদ্যুৎ হবে ১২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে চসিকের সরাসরি কোনো মূলধনী বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না। বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সমীক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তিনটি ব্যবসায়িক মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) সহযোগিতা মডেল, প্রাইভেট সেক্টর বেনিফিট মডেল ও লিমিটেড সাপোর্ট মডেল। প্রথম দুটি মডেলে ১১ শতাংশের বেশি অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার অর্জন সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে জি-টু-জি সহযোগিতা মডেলকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই মডেলে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিক্রি করা হবে। নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ সেন্ট। এতে প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১১ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর ল্যান্ডফিলে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। এতে বিদ্যমান ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও কমবে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান বলেন, জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের প্রকল্পটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটি সমীক্ষা চালিয়েছে।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমাদের তো দুটো প্রস্তাব আছে। একটা জাপানের এবং অন্যটি ইউকের প্রতিষ্ঠানের। আমরা চাচ্ছি, চট্টগ্রাম শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে। এজন্য আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আমরা বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই। সেক্ষেত্রে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা আগ্রহী।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চসিকের কাছে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ২০টি প্রস্তাব এসেছে। ২০২৩ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান ‘সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি’ চর বাকলিয়ায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সম্মতি দেয় এবং প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য চর বাকলিয়ায় ৩৫ একর খাস জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে চসিককে প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য চসিকের অনুকূলে প্রতীকী মূল্যে জমি বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়া গেলে তা সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভির ব্যবহারে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছিল চসিক। তবে চর বাকলিয়ায় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে আপত্তি জানান পরিবেশবাদীরা। সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
এর আগে ২০১৫ সালে চট্টগ্রামসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর চসিকের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
ওই প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাছাই করার কথা ছিল পিডিবির। পরে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সাথে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পের পূর্ত কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। বিওও (বিল্ড, ওন অ্যান্ড অপারেট) পদ্ধতিতে কেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ দুই দফা দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। ফলে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ‘ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড’, ‘ইমপ্যাক্ট এনার্জি’, ‘ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-এইচআইটিজেড-স্টার্টেম কনসোর্টিয়াম’, ‘অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড’, ‘সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি’, ‘সোলার্স পাওয়ার লিমিটেড’, ‘সিঙ এলিমেন্ট এনার্জি’, ‘রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’ এবং ‘এসডিআইসি’ চসিককে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়।
২০২১ সালের ৩ মে চায়নিজ ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও তৎকালীন মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন ১ হাজার ২শ থেকে ১ হাজার ৩শ টন বর্জ্য এবং ১২ থেকে ১৩ একর জমি প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়।
একই সময়ে সৌদি-জার্মান টেকনোলজি লিমিটেড নামের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানও চসিককে প্রস্তাব দেয়। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০ একর জমির প্রয়োজনের কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটি বর্জ্য সংগ্রহ, সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন ও জনবল, বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নেওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করে। এসব প্রস্তাবের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এর আগে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর ‘সোলার্স পাওয়ার লিমিটেড’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘এনডিওরিং এনার্জি’ও চসিককে প্রস্তাব দেয়। তারা সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) পদ্ধতিতে ৩০ একর জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা জানায়। এ জন্য প্রতিদিন ২ হাজার ৫শ টন বর্জ্য প্রয়োজন হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।


