...|...|...

বিশ্ব

গুহাবাস থেকে চীনের সর্বময় নেতা, শি জিনপিংয়ের উত্থানের গল্প

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৬
Shares
গুহাবাস থেকে চীনের সর্বময় নেতা, শি জিনপিংয়ের উত্থানের গল্প

চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন শি জিনপিং। দীর্ঘ এই সময়ে শুধু চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও দেশটির অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তিনি।

তবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর পথটি শি জিনপিংয়ের জন্য সবসময় মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত একটি পরিবারে জন্ম নিয়েও কৈশোরে তাকে যেতে হয়েছে নির্বাসন, দারিদ্র্য ও কঠিন গ্রামীণ জীবনের মধ্য দিয়ে। বলা যায়, তিনি ছিলেন সেই ‘রাজপুত্র’, যিনি একসময় প্রায় সবকিছু হারিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে জন্ম নেন শি জিনপিং। তার বাবা শি ঝংজুন ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম নেতা। পরবর্তী সময়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ঊর্ধ্বতন নেতা ও উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

শি ঝংজুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন শি জিনপিং। শৈশবে তিনি বেইজিংয়ের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন এবং এমন অনেক সুযোগ-সুবিধা পান, যা সাধারণ চীনা পরিবারের নাগালের বাইরে ছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায় তাদের পারিবারিক জীবনও।

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে শি জিনপিংয়ের বাবা রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়েন। তাকে দলবিরোধী চক্রের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাকে গ্রামাঞ্চলের একটি কারখানায় কাজের জন্য পাঠানো হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পরিবারের ওপর নিপীড়ন আরও তীব্র হয়। বাবাকে প্রতিবিপ্লবী হিসেবে চিহ্নিত করার কারণে কিশোর শিকেও পাঠানো হয় পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রে।

১৯৬৮ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে শহর ছেড়ে গ্রামীণ চীনে যেতে হয় তাকে। মাও জেদংয়ের ‘গ্রাম থেকে শেখার’ আহ্বানে সাড়া দিয়ে লাখো শহুরে তরুণের মতো তিনিও চলে যান শানসি প্রদেশের প্রত্যন্ত লিয়াংজিয়াহে গ্রামে।

সেখানে প্রায় সাত বছর কাটান তিনি। পাহাড়ের গুহায় তৈরি ‘ইয়াওদং’ ঘরে বসবাসের পাশাপাশি কৃষিকাজ, সার বহন ও নালা খননের মতো কঠিন শ্রম করতে হয়েছে তাকে।

পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে শি বলেছিলেন, ট্রেনে করে গ্রামে যাওয়ার সময় সবাই কাঁদছিলেন, কিন্তু তিনি হাসছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শহরে থেকে গেলে তিনি বেঁচে থাকতেন কি না, সেটিও জানতেন না।

গ্রামের জীবন ছিল কঠিন। ক্ষুধা ও উকুনের সমস্যায় ভুগেছেন তিনি। পরে অবশ্য সেই সময়ের অভিজ্ঞতাকেই নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখেছেন শি।

২২ বছর বয়সে শি জিনপিং গ্রাম ছেড়ে বেইজিংয়ে ফিরে চীনের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন।

স্নাতক শেষে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে মূলত ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াং প্রদেশে স্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে। অর্থনৈতিক সংস্কারের পর এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দ্রুত চীনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এ সময় ধীরে ধীরে দলের ভেতরে নিজের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেন শি। তার বাবার রাজনৈতিক পুনর্বাসনও তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

পরবর্তীকালে এদের অনেকেই শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

শি জিনপিং ১৯৭৯ সালে প্রথম বিয়ে করেন কে লিংলিংকে। তিনি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনের এক সাবেক রাষ্ট্রদূতের মেয়ে। তবে তিন বছর পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

পরে পেং লিউয়ানের সাথে তার পরিচয় হয়। পেং ছিলেন চীনের সামরিক বাহিনীর জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী এবং দেশটির অন্যতম পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে পেং লিউয়ান অনেক চীনার কাছেই তার স্বামী, তৎকালীন প্রাদেশিক কর্মকর্তা শির চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি চীনের ফার্স্ট লেডি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফরে শির সাথে অংশ নেন।

এই দম্পতির একমাত্র সন্তান কন্যা শি মিংজে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বলে জানা যায়।

২০০৭ সালে সাংহাইয়ের দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শি জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন।

এর মাত্র পাঁচ বছর পর, ২০১২ সালে তিনি হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

এরপর থেকেই চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে।

শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং প্রযুক্তি ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কেও উত্তেজনা বেড়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে শি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সমর্থকদের কাছে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও সমালোচকেরা এসব পদক্ষেপকে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখেছেন।

শির নামে ‘নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা’ নামে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের সীমা তুলে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে থাকার পথও তার জন্য উন্মুক্ত হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে।

শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই নেতার মধ্যে বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শির সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল। বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে শির নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথেও শির একসময় ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিল। তবে ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো একসময় রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার একটি পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।

গ্রামের গুহাবাস থেকে চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাদেশিক রাজনীতি থেকে পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটি দীর্ঘ এই যাত্রার পর তিনি এমন এক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যার সময়ে চীন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

তার শাসনের মূল্যায়নে সমর্থক ও সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ শাসন চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দেশটির বৈশ্বিক ভূমিকা, উভয় ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলেছে।