যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুটি প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন ক্রিস্টা পাইক। গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কয়েক দিন অচেতন ও ভেন্টিলেটরে থাকার পর এখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন এবং কথা বলছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মতে, প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও তার বেঁচে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নজিরবিহীন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দেয়। এরপর তাকে পেন্টোবার্বিটালের দুটি ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু এতে তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়নি। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং কয়েক দিন অচেতন অবস্থায় ইন্টুবেট করে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়।
পাইকের আইনজীবীদের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তার শরীরে অন্তত সাতটি সূঁচ ব্যবহার করে শিরায় ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাদের দাখিল করা নথিতে বলা হয়, দুটি ডোজ দেওয়ার সময় পাইককে কাঁদতে, গোঙাতে ও জোরে শ্বাস নিতে শোনা যাচ্ছিল। তাদের অভিযোগ, আইভি লাইন সঠিকভাবে বসানো হয়নি বা শিরা ফেটে যাওয়ার বিষয়টি কার্যকরকারী দলের সদস্যরা বুঝতে পারেননি। ফলে পেন্টোবার্বিটাল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে তার শরীরে প্রবেশ করছিল না।
আইনজীবীরা জানান, এমন জটিলতার আশঙ্কা তারা আগেই জানিয়েছিলেন। জানুয়ারিতে তারা টেনেসির প্রাণঘাতী ইনজেকশন পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন। এতে বলা হয়, পাইক থ্রম্বোসাইটোসিস নামের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি তার শিরা ছোট হওয়ায় সূঁচ ঢোকানোও কঠিন ছিল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইকের ডান হাত বেগুনি হয়ে যাচ্ছিল এবং পরে ইনজেকশনের জায়গাগুলোর আশপাশে জ্বালাপোড়া হচ্ছিল বলে জানান তার আরেক আইনজীবী র্যান্ডি স্পিভি। আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল জানান, চিকিৎসকেরা এখনও তার শরীর থেকে পেন্টোবার্বিটালের দুটি ডোজ দূর করার চেষ্টা করছেন।
তবে মঙ্গলবার আইনজীবীরা জানান, সব প্রতিকূলতার পরও পাইক এখন সচেতন এবং কথা বলছেন। ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অপরাধবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আরও সাতটি ঘটনায় বন্দিরা নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচেছিলেন। তবে সেসব ঘটনায় বন্দিদের শিরায় কোনো প্রাণঘাতী পদার্থ প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। পাইকের ঘটনা এদিক থেকে ব্যতিক্রম।
কেন পাইকের ওপর প্রয়োগ করা প্রাণঘাতী ওষুধ কাজ করেনি, তা এখনো স্পষ্ট নয়। টেনেসির সংশোধন বিভাগ বলেছে, তাদের প্রোটোকল অনুযায়ী যা করার কথা ছিল, তারা সেটিই করেছে। তবে রাজ্যের প্রোটোকলে দ্বিতীয়বার ডোজ দেওয়ার পরও কোনো বন্দি জীবিত থাকলে কী করতে হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। কর্তৃপক্ষ এখনো জানায়নি, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য আবার চেষ্টা করা হবে কি না।
এদিকে টেনেসির গভর্নর বিল লি এ ঘটনার তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বছরের বাকি সময় রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। এ ঘটনার পর রাজ্যের সংশোধন বিভাগের কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডাও পদত্যাগ করছেন।
কীভাবে বেঁচে গেলেন পাইক?
পাইকের আইনি দলের পরামর্শদাতা অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডক্টর জোয়েল জিভোট বলেন, পেন্টোবার্বিটালের দুটি ডোজ স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করলে পাইক নিশ্চিতভাবেই মারা যেতেন। তার ধারণা, ওষুধটি রক্তপ্রবাহে না গিয়ে ত্বকের নিচের কলায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তার বাহুতে ফোসকা দেখা যাওয়াও শিরা ফেটে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
পাইকের থ্রম্বোসাইটোসিসও এতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে মনে করেন জিভোট। এ অবস্থায় ইনজেকশনের জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে পেন্টোবার্বিটাল শিরায় প্রবেশে বাধা তৈরি করতে পারে। ওষুধটির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ত্রুটিপূর্ণ উৎপাদন বা অনুপযুক্ত সংরক্ষণও কারণ হতে পারে বলে জানান তিনি।
পাইক জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর জিভোট বিবিসিকে বলেন, প্রাণঘাতী ইনজেকশন নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই মারা যান। তাই পাইকের বেঁচে যাওয়াকে তিনি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তার শরীরে কতটা পেন্টোবার্বিটাল প্রবেশ করেছে, রক্তে ওষুধটির মাত্রা কত ছিল এবং ভবিষ্যতে তার সুস্থতা কেমন হবে—এসব বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এরপর কী হবে?
হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি পাইকের শরীর থেকে পেন্টোবার্বিটাল দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেও দীর্ঘমেয়াদে তার শারীরিক বা স্নায়বিক কোনো সমস্যা হবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। জিভোটের মতে, ওষুধটির মাত্রা কমতে এবং ভালোভাবে স্নায়বিক পরীক্ষা করতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এমনকি তিনি বেঁচে গেলেও গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পাইকের আইনজীবীরা তার সাজা কমানোর আবেদন করেছেন। বুধবার তাদের আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তারা পাইকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। আইনজীবীরা আরও জানিয়েছেন, জ্ঞান ফেরার পরও গুরুতর আঘাত পাওয়া বাহুতে চিকিৎসা চলার মধ্যেই পাইক পাহারার মধ্যে বিছানার সঙ্গে হাতকড়া ও শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় আছেন।
এর আগে কি এমন ঘটনা ঘটেছে?
যুক্তরাষ্ট্রে ত্রুটিপূর্ণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটিতে এক-তৃতীয়াংশের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ত্রুটি বা গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে প্রাণঘাতী ইনজেকশন নেওয়ার পরও বেঁচে যাওয়ার ঘটনা পাইকের ক্ষেত্রেই প্রথম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালেও টেনেসিতে এমন আরেকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৪ সালে তিনজনকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড মে মাসে স্থগিত করা হয়। কারণ কর্মকর্তারা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত শিরা খুঁজে পাননি। পরে গভর্নর তাকে এক বছরের জন্য মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেন।
পেন্টোবার্বিটাল কী?
পেন্টোবার্বিটাল একটি শক্তিশালী ঘুমের ওষুধ, যা স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের কার্যক্রম ধীর করে দেয়। চিকিৎসায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হলেও উচ্চ মাত্রায় প্রাণঘাতী ইনজেকশন হিসেবেও প্রয়োগ করা যায়।
গত বছর বাইডেন প্রশাসনের সময় মার্কিন সরকারের এক পর্যালোচনায় এই ওষুধের কারণে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও যন্ত্রণা হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে ফেডারেল মৃত্যুদণ্ডে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও টেনেসির মতো অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক ছিল না।
ক্রিস্টা পাইক কী অপরাধ করেছিলেন?
বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইককে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে স্লেমারকে হত্যা করা হয়।
ক্যাম্পের আরও দুজন বাসিন্দা পরে সাক্ষ্য দেন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে পাইক তাদের কাছে বড়াই করেছিলেন এবং স্লেমারের মাথার খুলির একটি টুকরোও দেখিয়েছিলেন। পাইকের তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপকে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি আইনত প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।



