দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার (ওসেক)। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি চিকিৎসাসেবা। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ইউনিটটি পড়ে আছে ব্যবহারহীন অবস্থায়।
শুধু চালু না হওয়াই নয়, নির্মাণকাজের মান এবং দরপত্র অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতালের নিজস্ব পরিদর্শন কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দরপত্রে উল্লিখিত কাজের সাথে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য ও বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়ার কথা লিখিতভাবে জানিয়েছে।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের পূর্বের জরুরি বিভাগের অংশে নির্মিত ওসেক ইউনিটটি তালাবদ্ধ। ভেতরে রয়েছে কক্ষ ও সেন্ট্রাল এসিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব স্থাপনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে ওসেক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে দরপত্র খোলা হয় এবং একই বছরের মার্চ থেকে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় নেওয়া এ কাজে সিভিল ও ইলেকট্রিক্যাল অংশে ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৯১ লাখ ১৫ হাজার ১৬৬ টাকা। আর গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৫০২ টাকা। দুই খাতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২ কোটি ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৬৮ টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিটটিতে থাকার কথা ৬ শয্যার হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ৪ শয্যার আইসিইউ, ১০টি জেনারেল বেড এবং একটি মিনি অপারেশন থিয়েটার। অর্থাৎ সংকটাপন্ন রোগীদের একই স্থানে দ্রুত পর্যবেক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যেই এটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু অবকাঠামো তৈরি হলেও সেই চিকিৎসাসেবা এখনো শুরু হয়নি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দিলীপ কুমার কুন্ড বলেন, ওসেক চালু করা গেলে হাসপাতালের ইনডোরে রোগী ভর্তির চাপ অনেকাংশে কমবে। সংকটাপন্ন রোগীরাও দ্রুত উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় ইউনিটটি চালু করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেখানে থাকা সেন্ট্রাল এসিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করে ইউনিটটি চালুর দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম রাজিব বলেন, রুমসহ নির্মাণকাজ তাদের পক্ষ থেকে সম্পন্ন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্ব।
তবে নির্মাণকাজ নিয়ে সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখের একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, হাসপাতালের গঠিত কমিটি ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার, ৫ শয্যার অবস আইসিইউ এবং ৫ শয্যার পেডিয়াট্রিকস আইসিইউ পরিদর্শন করেছে।
পরিদর্শনকালে কমিটি দরপত্রে উল্লিখিত কাজের বিবরণের সাথে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ্য করে। চিঠিতে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি দ্রুত সংশোধন করে হস্তান্তরপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. কাজী আইনুল ইসলাম। এর অনুলিপি দেওয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক, খুলনা বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য), হাসপাতালের উপ-পরিচালক এবং গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের।
একদিকে গণপূর্ত অধিদফতরের দাবি, নির্মাণকাজ শেষ করে অবকাঠামো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালের পরিদর্শন কমিটির লিখিত নথিতে দরপত্রের সাথে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য ও বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে- পরিদর্শন কমিটি ঠিক কী কী ত্রুটি পেয়েছিল? সেগুলো কতটা সংশোধন হয়েছে? ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর সংশোধন না করেই অবকাঠামো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়েছে কি না? আর দরপত্র অনুযায়ী সব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না তারও পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
একইসাথে প্রশ্ন রয়েছে প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েও। প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংস্থান নিশ্চিত করা হয়নি কেন? প্রকল্পটি কেন বন্ধ হয়ে গেল এবং ইউনিটটি চালুর পরবর্তী পরিকল্পনা কী সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, একটি প্রকল্পের আওতায় ওসেকের কাজ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউনিটটি চালু করা গেলে খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে এবং সংকটাপন্ন রোগীরা আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নেই রোগীর জন্য কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। একদিকে যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংকট, অন্যদিকে হাসপাতালের নথিতে নির্মাণকাজে ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ দুই বিষয়ই এখন সামনে এসেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটটি কবে চালু হবে, হাসপাতালের পরিদর্শন কমিটি যে ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা জানিয়েছে সেগুলো কী এবং সেগুলোর সমাধান হয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই প্রত্যাশিত।
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি চিকিৎসা অবকাঠামো পড়ে না থেকে দ্রুত রোগীর কাজে আসবে এটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।



