খুঁটিতে বাঁধা বাবার মুখে রুটি তুলে দেওয়ার সেই দৃশ্যের পর চার মাস বিদ্যালয়ের বাইরে ছিল ছোট্ট তুবা। অবশেষে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরেছে চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা নিজে তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান।
এ সময় তুবার মা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক, সহপাঠী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ইউএনও তুবার হাত ধরে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। দীর্ঘদিন পর স্কুলে ফিরতে পেরে তুবাও ছিল উচ্ছ্বসিত।
তুবার পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সহযোগিতা চেয়েছেন ইউএনও মো. আলী সুজা। তিনি বলেন, আমরা সমাজের সব অসঙ্গতি হয়তো দূর করতে পারবো না। কিন্তু একটি পরিবারকে সুরক্ষা দিয়ে অন্তত সমাজে একটি মডেল তৈরি করতে পারি। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আশা করি, আমরা তা পারব।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, তুবাকে তারা সাদরে গ্রহণ করেছেন। বাবার সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর থেকেই সে বিদ্যালয়ে আসছিল না। তবে তুবা মেধাবী ছাত্রী উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার পড়াশোনা যাতে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, সে জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
পরিবারটির পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে তুবার বাবার চিকিৎসার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বরিশাল নগরীর একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে অনিক সরদারকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে তিন মাস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এর ব্যয় উপজেলা প্রশাসন বহন করবে।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তুবার পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নেও কাজ করা হবে। তিনি বলেন, বাবাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই প্রথম কাজ। এরপর তুবার মায়ের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। একইভাবে অনিক সরদার সুস্থ হয়ে ফিরলে তার জন্যও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তুবার বাবা-মেয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান ইউএনও। তাদের আর্থিক সহায়তা এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা মিলিয়ে তুবার পড়াশোনার খরচ চালানোর ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য তুবার মায়ের নামে একটি স্থায়ী আমানত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির অভিযোগ ওঠে অনিক সরদারের বিরুদ্ধে। এরপর স্থানীয় কয়েকজন তাকে মারধর করে বাজারের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখেন বলে জানা যায়।
পরদিন সকালে বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে ছুটে যায় অনিক সরদারের নয় বছর বয়সী মেয়ে তুবা। বাবাকে আর মারধর না করার জন্য উপস্থিত লোকজনের কাছে অনুরোধ করে সে। পরে বাবার হাতে থাকা চায়ের সাথে রুটি ভিজিয়ে নিজের হাতে তাকে খাওয়ায় তুবা।
ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সাথে অনিক সরদারের পা বাঁধা। তার হাতে ছিল চায়ের কাপ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুবা রুটি ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। এ সময় আশপাশের লোকজন বিভিন্ন কথা বলছিলেন এবং তুবাকে অসহায়ভাবে তাদের দিকে তাকাতে দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের অনেকেই তুবা ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই ঘটনার পর এবার বিদ্যালয়ে ফিরল তুবা।



