...|...|...

সারাদেশ

কুমিল্লায় তাজমিন হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি গ্রেফতার

কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৪১ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৩
Shares
কুমিল্লায় তাজমিন হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি গ্রেফতার

ছবি: সংগৃহীত

‘বাবা, আমাকে নিয়ে যাও’-মৃত্যুর আগে বাবার কাছে এমনই আকুতি জানিয়ে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল কুমিল্লার লালমাইয়ে হত্যার শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। কিন্তু গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় মেয়ের সেই বার্তা দেখতে পারেননি বাবা আব্দুল আলীম। সকালে মুঠোফোনে মেসেজ দেখে লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেয়ের নিথর দেহ দেখতে পান তিনি।

এ ঘটনায় চাঞ্চল্যকর অগ্রগতি হয়েছে। তাজমিন হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, প্রযুক্তির সহায়তা ও বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।হত্যাকাণ্ডে তার সাথে আর কেউ জড়িত ছিল কি না এবং কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে, তা জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে নিহতের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলীমের মেয়ে। তার বাবা চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাজমিন নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। পরে সে বান্ধবীর সাথে কক্সবাজারে যায়।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে ওঠে সে। মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে রাতে কয়েকবার ফোন করেন বাবা। তবে তাজমিন ফোন রিসিভ করেনি।

এরপর রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে বাবার মুঠোফোনে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠায় তাজমিন। সেখানে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিল সে। কিন্তু সেই বার্তা তখন বাবার চোখে পড়েনি।

এদিকে হাইওয়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। পরে হোটেলসংলগ্ন কয়েকটি খাবার ও স্টেশনারি দোকানের সামনে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। রাত ১২টার দিকে একটি দোকানির সাথে কথা বলার সময় মুঠোফোনে কিছু একটা দেখাতেও দেখা যায় তাকে।


রাত সোয়া ১২টার দিকে হোটেল এলাকা ছেড়ে চলে যায় তাজমিন। এরপর কীভাবে এবং কার সঙ্গে সে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের নির্জন ফসলি জমিতে পৌঁছায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের সময় তার শরীরে পোশাক ছিল না এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। আশপাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলের পাশে পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কিছু দূরে পাওয়া যায় তার ভ্যানিটি ব্যাগ।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তাজমিনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ ও অন্য কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে গ্রেফতার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি নিখোঁজ মুঠোফোন উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

একটি ছোট্ট বার্তায় বাবার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল তাজমিন। কিন্তু সেই বার্তার পরিণতি হয়েছে এক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। এখন গ্রেফতার প্রধান অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বাকি রহস্য উদ্‌ঘাটনের অপেক্ষায় স্বজন ও এলাকাবাসী।