...|...|...

লাইফস্টাইল

কিডনির নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে বদলে ফেলুন এই অভ্যাসগুলো

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, রাত ১০:১৯ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:১৫
Shares
কিডনির নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে বদলে ফেলুন এই অভ্যাসগুলো

ছবি: সংগৃহীত

কিডনি আমাদের শরীরের এক নীরব কর্মী। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে রক্ত ছেঁকে বর্জ্য বের করে দেওয়া, শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখা আর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা- এসবই নীরবে চালিয়ে যায় কিডনি। 

কিন্তু সমস্যা হলো, কিডনির জটিলতা প্রায়ই একদম নিঃশব্দে শুরু হয়। শুরুর দিকে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না বলে অনেকে যখন বুঝতে পারেন, ততদিনে ক্ষতি অনেকটাই হয়ে যায়। তবে ভালো খবর হলো, দৈনন্দিন জীবনের কিছু ছোট অভ্যাস বদলালেই কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্বজুড়ে নেফ্রোলজিস্ট ও কিডনি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে যেসব পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তার মূল কথা একটাই- কিডনি সুস্থ রাখা কোনো একদিনের কাজ নয়, বরং এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের যোগফল।

যেসব অভ্যাস নিয়মিত রাখা উচিত

১. রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করুন

উচ্চ রক্তচাপ কিডনির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। রক্তনালির ভেতর দিয়ে অতিরিক্ত চাপে রক্ত প্রবাহিত হলে কিডনির সূক্ষ্ম ফিল্টারগুলো (নেফ্রন) ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রক্তচাপ যেন সবসময় ১৪০/৯০-এর নিচে থাকে, আর এজন্য বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

২. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন

সপ্তাহে অন্তত ১২০ মিনিট শরীরচর্চার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। এর মানে এই নয় যে জিমে গিয়ে ভারী ব্যায়াম করতেই হবে- নিয়মিত হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং বা ঘরোয়া ব্যায়ামও যথেষ্ট উপকারী। শরীরচর্চা রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে কিডনিকেও সুরক্ষা দেয়।

৩. ডায়াবেটিস পরীক্ষা করান নিয়মিত

কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে তা কিডনির রক্তনালিগুলোর ক্ষতি করে। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

৪. শরীরের সংকেত উপেক্ষা করবেন না

প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া, শরীরের কোনো অংশ- বিশেষত পা, গোড়ালি বা চোখের নিচে- অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবে ফেনা হওয়া কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ ও রঙে হঠাৎ পরিবর্তন এলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণ কিডনির সমস্যার প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।

৫. বছরে অন্তত একবার কিডনি ফাংশন টেস্ট করান

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনির প্রকৃত অবস্থা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করানো। এক্ষেত্রে দুটি পরীক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- 

  • eGFR (Estimated Glomerular Filtration Rate):রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় কিডনি কতটা কার্যকরভাবে বর্জ্য ছেঁকে বের করছে।
  • uACR (Urine Albumin-Creatinine Ratio): প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামক প্রোটিন কতটা বের হয়ে যাচ্ছে, তা দেখে কিডনির ফিল্টারিং সিস্টেমে কোনো ফাঁকফোকর আছে কিনা বোঝা যায়।

যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস আছে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য এই পরীক্ষাগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে সতর্কতা জরুরি

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওভার-দ্য-কাউন্টার ব্যথানাশক- বিশেষ করে NSAID জাতীয় ওষুধ (যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক) নিয়মিত সেবন কিডনির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এসব ওষুধ দীর্ঘদিন নিয়মিত খেলে কিডনির রক্তপ্রবাহে প্রভাব পড়ে, যা ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

কোনো ওষুধ কেন প্রয়োজন তা না জেনে দীর্ঘদিন সেবন করার অভ্যাস অনেক ক্ষেত্রেই আরও বড় স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়। তাই যেকোনো ওষুধ শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তা বন্ধ করে দেওয়াই ভালো।

কিডনির জন্য পানি কতটা উপকারী?

পর্যাপ্ত পানি পান কিডনির কার্যকারিতা ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তের রাসায়নিক ভারসাম্য ও ইলেকট্রোলাইট নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখে। প্রশ্ন হলো, দিনে ঠিক কতটুকু পানি পান করা উচিত?

চিকিৎসকদের সাধারণ পরামর্শ হলো, খাবারের মাধ্যমে শরীরে যে পানি প্রবেশ করে তার বাইরে অতিরিক্ত হিসেবে প্রায় আড়াই লিটার পানি পান করা উচিত। তবে এই পরিমাণ ব্যক্তিভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে- শরীরের ওজন, পরিবেশের তাপমাত্রা, শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা এবং আগে থেকে কোনো কিডনি সমস্যা আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে এই পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যেহেতু বাড়তি পানি বের হয়ে যায়, তাই এখানকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ পানি নাকি ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানি?

অধিকাংশ মানুষের জন্য সাধারণ বিশুদ্ধ পানিই যথেষ্ট। এমনকি নিয়মিত শরীরচর্চা করলেও বেশির ভাগ মানুষের এতটা তীব্র ব্যায়াম হয় না যে অতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে।

তবে কারও যদি ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানি পান করতে ভালো লাগে এবং তার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে পানি পানের পরিমাণ বাড়ে, তাহলে তা গ্রহণ করা যেতে পারে- শর্ত থাকে যে রক্ত পরীক্ষায় কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক থাকতে হবে। কিডনির সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে, তাই এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

খাদ্যাভ্যাসেও রাখতে হবে নজর

শুধু পানি বা ওষুধ নয়, প্রতিদিনের খাবারও কিডনির স্বাস্থ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত যেসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন-

১. লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, যা কিডনির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। প্রক্রিয়াজাত ও ভাজাপোড়া খাবারে লবণের মাত্রা বেশি থাকে বলে এসব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা ভালো।

২. শাকসবজি ও ফলমূল বেশি রাখুন: তাজা শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার প্রদাহবিরোধী এবং কিডনির জন্য সহায়ক।

৩. অতিরিক্ত প্রোটিন এড়িয়ে চলুন: প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রোটিন গ্রহণ কিডনির ওপর বাড়তি চাপ ফেলতে পারে, বিশেষত যাদের কিডনির কার্যক্ষমতা আগে থেকেই কিছুটা কম।

৪.ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যা ঘুরেফিরে কিডনির ওপরই চাপ তৈরি করে।

ধূমপান থেকে দূরে থাকুন

ধূমপান কিডনিতে রক্ত সরবরাহের গতি কমিয়ে দেয়, ফলে কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান কিডনি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই কিডনি সুরক্ষায় ধূমপান পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।

কিডনি সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় পরামর্শ

কিডনি সুস্থ রাখার প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের একটি পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের মতে, চিকিৎসাধীন অনেক রোগীর মধ্যেই পরবর্তীতে একটি সাধারণ আক্ষেপ দেখা যায়- তারা নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে ফলোআপ করেননি, নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব ঠিকমতো নেননি, নিয়মিত ওষুধ সেবন করেননি, কিংবা নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছে যথেষ্ট প্রশ্নও করেননি।

এখান থেকে একটি স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়- নিজের রোগ ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে সঠিকভাবে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে চারটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ-

  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো
  • প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সময়মতো গ্রহণ করা
  • নির্ধারিত ওষুধ নিয়মমাফিক সেবন করা
  • নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং চিকিৎসকের কাছে প্রশ্ন করতে দ্বিধা না করা

শেষ কথা

কিডনি আমাদের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যার সমস্যা শুরুতে প্রায় বোঝাই যায় না। কিন্তু এই নীরবতাকে অবহেলা না করে যদি প্রতিদিনের জীবনে কয়েকটি ছোট অভ্যাস- পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ না খাওয়া যদি রপ্ত করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

কিডনি ভালো রাখার লড়াইটা আসলে একদিনের নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তেরই ফল।

তথ্যসূত্র: National Kidney Foundation, NIDDK (National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases), এবং বিভিন্ন নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অবলম্বনে।