...|...|...

ধর্ম

অশান্ত মনকে শান্ত করতে করবেন যেসব কোরআনিক আমল

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০৯ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:১৩
Shares
অশান্ত মনকে শান্ত করতে করবেন যেসব কোরআনিক আমল

অশান্ত মনকে শান্ত করতে কোরআনে বর্ণিত যেসব আমল করবেন। ফাইল ছবি

মানুষের জীবনে দুঃখ, হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা নানা সময় নেমে আসে। প্রিয়জন হারানো, জীবিকার অনিশ্চয়তা, ব্যর্থতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা- এসব কারণে অনেক সময় মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় এসব সংকট মোকাবিলায় আল্লাহর ওপর বিশ্বাস, ধৈর্য ও সৎকর্মের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে এমন কিছু নির্দেশনা রয়েছে, যা মানুষের মনে আশা ও প্রশান্তি তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে। কোরআনের আলোকে মানসিক কষ্ট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আমল তুলে ধরা হলো।

১. আল্লাহর প্রতি ঈমান ও সৎকর্ম

মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো আল্লাহর ওপর ঈমান রাখা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত পৌঁছাবে, তখন যারা আমার হেদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩৮)

আল্লাহ আরও বলেন, নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে... এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে প্রতিদান। তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬২)

২. তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা

জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয় আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়- এই বিশ্বাস মানুষের দুঃখ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আল্লাহ বলেন, পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি তা সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখিনি। (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২২–২৩)

এই আয়াতেই বলা হয়েছে, মানুষ যেন যা হারিয়েছে তার জন্য অতিরিক্ত শোকাহত না হয় এবং যা পেয়েছে তা নিয়ে অহংকারে মত্ত না হয়।

৩. তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির চর্চা

পাপ, অন্যায় ও শিরক থেকে নিজেকে দূরে রেখে চরিত্র ও কর্ম সংশোধনের চেষ্টা করাও অন্তরের প্রশান্তির একটি পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে আল্লাহকে ভয় করবে (তাকওয়া অবলম্বন করবে) এবং নিজেকে সংশোধন করবে, তার কোনো ভয় থাকবে না এবং সে দুঃখিতও হবে না। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৫)

৪. মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করা

অন্যের কল্যাণে কাজ করা এবং সৎকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রতিও কোরআনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর তারা সেই বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, দুঃখও কোরো না; বরং তোমাদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ গ্রহণ করো। (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩০)

৫. দান-সদকা করা

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান-সদকা করাও অন্তরের প্রশান্তির মাধ্যম হতে পারে। তবে দানের পর কারও প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ বা তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, এরপর সেই দানের কথা বলে অনুগ্রহ প্রকাশ করে না এবং কোনো কষ্টও দেয় না, তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬২)

৬. নিজের দুঃখ আল্লাহর কাছে তুলে ধরা

মানুষের কাছে অভিযোগ না করে নিজের কষ্ট ও অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে নিবেদন করার দৃষ্টান্ত রয়েছে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনে। সন্তান ইউসুফের (আ.) বিচ্ছেদে গভীর শোকের মধ্যেও তিনি আল্লাহর কাছেই নিজের কষ্ট প্রকাশ করেছিলেন।

কোরআনে তাঁর বক্তব্য এসেছে, আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৬)

৭. ভালো পরিণতির আশায় অপেক্ষা করা

উহুদের যুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতি, সাহাবিদের শাহাদাত এবং রাসুলুল্লাহর (সা.) শাহাদাতের গুজব মুসলমানদের মধ্যে গভীর শোক তৈরি করেছিল। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জীবিত দেখে তাদের সেই দুঃখ অনেকটাই দূর হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, অতঃপর তিনি তোমাদের এক দুঃখের পর আরেক দুঃখ দিলেন, যাতে তোমরা যা হারিয়েছ কিংবা যে বিপদ তোমাদের ওপর এসেছে, তার জন্য অতিরিক্ত শোকাহত না হও। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৩)

৮. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া

কঠিন সময় ও অতিরিক্ত উদ্বেগের মধ্যে শরীর ও মনকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার গুরুত্বও কোরআনের একটি ঘটনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। উহুদের যুদ্ধের সংকটময় সময়ে আল্লাহ মুসলমানদের ওপর তন্দ্রার মাধ্যমে প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন।

আল্লাহ বলেন, অতঃপর সেই দুঃখ-কষ্টের পর তিনি তোমাদের ওপর নিরাপত্তাস্বরূপ এক ধরনের তন্দ্রা নাজিল করলেন, যা তোমাদের একটি দলকে আচ্ছন্ন করেছিল। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৪)

৯. নেককার মানুষের সঙ্গ নেওয়া

বিপদের সময় একজন ঈমানদার ও নেককার মানুষের সঙ্গ হতাশার পরিবর্তে সাহস ও আশাবাদ তৈরি করতে পারে। এমন সঙ্গী আল্লাহর রহমত ও সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

হিজরতের সময় গুহায় অবস্থানের ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন, দুঃখ কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ৪০)

১০. প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো

কঠিন পরীক্ষার সময় মারইয়াম (আ.)-কে আল্লাহ একদিকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, অন্যদিকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার সুযোগও দিয়েছেন। কোরআনে এসেছে, তুমি দুঃখ কোরো না। তোমার প্রতিপালক তোমার পায়ের নিচে একটি ঝরনার ব্যবস্থা করেছেন। আর খেজুর গাছের কাণ্ডটি নিজের দিকে নাড়াও; তাতে তোমার ওপর ঝরে পড়বে পাকা ও তাজা খেজুর। অতঃপর তুমি খাও, পান করো এবং চোখ জুড়াও। (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৪–২৬)

সংকটের মধ্যেও রয়েছে আশার বার্তা

মানসিক কষ্ট ও দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক পরীক্ষার অংশ। তবে কোরআনের নির্দেশনা মানুষকে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য, দোয়া, জিকির ও সৎকর্মের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার শিক্ষা দেয়।

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করা এবং কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা একজন মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি ও আশার অনুভূতি জাগাতে পারে।