নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের হোকসে গ্রাম। পাহাড়ঘেরা এই গ্রামটি বহু বছর ধরেই পরিচিত ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। কারণ, এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য, ঋণ ও প্রতারণার ফাঁদে পড়ে একটি করে কিডনি বিক্রি করেছেন। গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক গ্রামবাসীকে দালালরা এমনও বলেছিল—কিডনি কেটে নিলেও সেটি আবার গজাবে।
হোকসে নেপালের কাভ্রেপালাঞ্চক জেলার পাঁচখাল পৌরসভার ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গ্রাম। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ ও দিনমজুরি। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং দ্রুত টাকা পাওয়ার প্রলোভনকে কাজে লাগিয়ে অঙ্গ পাচারচক্র গ্রামের মানুষদের টার্গেট করত। একটি নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় তিন দশক ধরে গ্রামের বহু মানুষ কিডনি বিক্রির জন্য ভারতে গেছেন।
দালালদের ভূমিকা ছিল এই চক্রের কেন্দ্রে। গবেষণা অনুযায়ী, তারা প্রথমে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের খুঁজে বের করত, কখনো কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখাত, পরে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দিত। সীমান্ত পার করাতে ভুয়া কাগজপত্র এবং কৃত্রিম আত্মীয়তার নথিও তৈরি করা হতো। অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি বিক্রেতাদের অস্ত্রোপচারের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হতো না।
গ্রামবাসীদের বিভ্রান্ত করতে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করা হতো। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাঁদের বলা হয়েছিল মানুষের দুটি কিডনির একটি ‘অপ্রয়োজনীয়’, আবার কারও দাবি—দালালরা আশ্বাস দিয়েছিল, কিডনি অপসারণের পর সেটি আবার গজিয়ে উঠবে। ২০১৪ সালে টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে হোকসের এক বাসিন্দা জানান, তাঁকে বলা হয়েছিল কিডনি বিক্রি করলে স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা হবে না এবং সেটি আবার গজাবে।
২০২4 সালে স্কাই নিউজ হোকসে গিয়ে বেশ কয়েকজন কিডনি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে। কঞ্চা ও রাম নামে দুই ব্যক্তি তাঁদের অস্ত্রোপচারের দাগ দেখিয়ে জানান, আর্থিক সংকটের কারণেই তাঁরা কিডনি বিক্রি করেছিলেন। কঞ্চা বলেন, অস্ত্রোপচারের পরও তিনি ব্যথায় ভুগছেন এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় অনেকেই মনে করেন গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এমন কেউ আছেন যিনি একটি কিডনি বিক্রি করেছেন। তবে এই সংখ্যাটি আনুষ্ঠানিক সরকারি পরিসংখ্যান নয়।
একটি গবেষণা-প্রটোকলে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের আগেই হোকসের ৩০০ জনের বেশি বাসিন্দা কিডনি বিক্রি করেছিলেন বলে আগের গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল। কারও কারও কিডনি মাত্র কয়েকশ ডলারের বিনিময়েও বিক্রি হয়েছিল। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দারিদ্র্য আরও বেড়ে যাওয়ায় গ্রামটির মানুষের ঝুঁকিও বাড়ে।
অঙ্গ বিক্রি নেপাল ও ভারতে আইনসিদ্ধ নয়, তবু নেপাল-ভারতের উন্মুক্ত ও সহজগম্য সীমান্ত অঙ্গ পাচারচক্রের কার্যক্রমকে সহজ করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিডনি বিক্রির পর অনেকেই প্রতিশ্রুত অর্থ পুরোটা পাননি; আবার কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা ও কাজের সক্ষমতা হারানোর কথাও জানিয়েছেন।
হোকসের ‘কিডনি ভ্যালি’ পরিচয় তাই কোনো চিকিৎসাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, সীমিত কর্মসংস্থান, আর্থিক অসহায়ত্ব এবং সংগঠিত দালালচক্রের প্রতারণা। গবেষকেরা বলছেন, শুধু দারিদ্র্য দিয়ে পুরো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায় না; স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগ, দালালদের নেটওয়ার্ক ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে রাজি করানোর প্রক্রিয়াও এই অবৈধ বাণিজ্য বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে।


