...|...|...

সারাদেশ

১২ পদের ৯টি শূন্য, তিন শিক্ষকেই চলছে ৫ শতাধিক ছাত্রীর ক্লাস

ইমরান মোল্যা, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:০১
Shares
১২ পদের ৯টি শূন্য, তিন শিক্ষকেই চলছে ৫ শতাধিক ছাত্রীর ক্লাস

ফরিদপুরের বোয়ালমারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে মাত্র তিনজন নিয়মিত শিক্ষক দিয়ে। বিদ্যালয়টির অনুমোদিত ১২টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৯টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ের একজন শিক্ষক বিএড প্রশিক্ষণে থাকায় নিয়মিত পাঠদানেও তার উপস্থিতি সীমিত। ফলে শিক্ষকসংকটে ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণি কার্যক্রম ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয়ভাবে চারজন খণ্ডকালীন অতিথি শিক্ষক দিয়ে কোনো রকমে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা সদরের দক্ষিণ শিবপুর মহল্লায় প্রায় দেড় একর জমির ওপর ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এটি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের সময় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছিল ১১টি। পরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের আরও একটি পদ যুক্ত হলে মোট শিক্ষক পদ দাঁড়ায় ১২টি। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ও শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষকসহ নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, বাংলা ও ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে তিনজন শিক্ষককেই একাধিক বিষয়ে ও একাধিক শ্রেণিতে অতিরিক্ত পিরিয়ড নিতে হচ্ছে। চারজন খণ্ডকালীন অতিথি শিক্ষক যুক্ত করেও শিক্ষকসংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি কর্মচারীর সংকটও প্রকট। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত চারটি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী। ২০১৫ সাল থেকে অফিস সহকারী এবং ২০২১ সাল থেকে দফতরি পদ শূন্য রয়েছে। নেই কোনো আয়া বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ফলে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, ভবন ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতেও সমস্যা হচ্ছে। কয়েকটি শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় সূত্র।

জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে নির্মিত ছয়তলা ভবনে বর্তমানে বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে। অন্য ভবনগুলো বোর্ড পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সময়ে ব্যবহার করা হলেও বছরের অধিকাংশ সময় সেগুলো অব্যবহৃত থাকে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে। শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস ও ব্যবহারিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী অনিকা সরকার জানায়, শিক্ষক না থাকায় উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিয়মিত হয় না। বিজ্ঞানাগার থাকলেও শিক্ষকসংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারিক কার্যক্রম হচ্ছে না।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম মৃধা জানায়, শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। ঘাটতি পূরণে তাদের বাইরে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে।

অভিভাবক আব্দুল গফফার মোল্যা বলেন, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংকট দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। শিক্ষকসংকটের কারণে আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।

খণ্ডকালীন শিক্ষক বিউটি পারভীন বলেন, সারা মাস পাঠদান শেষে বিদ্যালয় থেকে সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই সম্মানী অত্যন্ত কম।

বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষক মাসুদুল ইসলাম বলেন, ১২ জন শিক্ষকের কাজ সামলাতে খণ্ডকালীন চারজন শিক্ষক, তিনি ও প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জনকে প্রতিদিন একাধিক পিরিয়ড নিতে হচ্ছে। একটি ক্লাস শেষ করেই আরেকটি ক্লাসে যেতে হয়। ফলে পাঠদানের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায় না। এতে কাঙ্ক্ষিত মানের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক সুকান্ত চন্দ্র মণ্ডল বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যোগদানের পরই শিক্ষক-কর্মচারীর সংকটের বিষয়টি লিখিতভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালককে জানানো হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয়ভাবে তহবিল সংগ্রহ করে অতিথি শিক্ষকদের সামান্য সম্মানী দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ প্রয়োজন।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট অধিদফতর ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরকে জানানো হয়েছে। শিক্ষকসংকট নিরসনে তার পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই শূন্য পদে শিক্ষক দেওয়ার আশা করছেন তিনি।