...|...|...

বিশ্ব

সৌদির নিরাপত্তায় যেকোনো পদক্ষেপ নেবে পাকিস্তান, সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:২০
Shares
সৌদির নিরাপত্তায় যেকোনো পদক্ষেপ নেবে পাকিস্তান, সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারি

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে কিংডমের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করছে পাকিস্তান বলে জানিয়েছেন দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফট্যানেন্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রবিবার ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট আরাবিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামরিক এই মুখপাত্র এই মন্তব্য করেন। হুথিদের মারাত্মক হামলার মুখোমুখি হওয়া সৌদি আরবের সুরক্ষায় পাকিস্তান ও রিয়াদ যৌথ প্রতিহতকরণের লক্ষ্যে দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে—যার মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ এবং তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’।

হুথিদের হামলা মোকাবিলায় পাকিস্তানকে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে দেখা যাবে—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডিজি আইএসপিআর বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং বিশেষ করে পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তা পাকিস্তানের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।

তিনি জোরালোভাবে বলেন, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ অটুট এবং অনমনীয়। তাই এটি নিশ্চিত করতে যা যা সহায়তা প্রয়োজন, তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। তবে কোনো জোটই প্রদত্ত সহায়তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও পরিমাণ প্রকাশ করে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সৌদির নিরাপত্তায় আপস নেই

সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল—এমন প্রশ্নে সামরিক মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মাঝে, শিশু থেকে শুরু করে আমাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে এই বিষয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিক্রিয়া হলো—সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ কেন সৌদি আরব বা পবিত্র স্থানগুলোকে আক্রমণ বা হুমকি দেবে কিংবা পবিত্র স্থানগুলোকে হুমকির মুখে ফেলার সামান্যতম আভাসও দেবে কেন? পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের যদি-কিন্তু থাকতে পারে না বলে তিনি ঘোষণা দেন।

হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তানের সহায়তা কেবল প্রতিরক্ষামূলকই থাকবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজি আইএসপিআর জানান যে জোটের তিন সদস্যই সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে এই জোটের কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই; এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরক্ষামূলক।

জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের সমষ্টিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ধরনের ব্যবস্থা অঞ্চলটির বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে অত্যন্ত শক্ত ও স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আপনারা যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তবে এর জবাব হবে সমষ্টিগত। তিনি আরও বলেন, যদি সেই প্রতিরোধ কাজ না করে, তবে তিন দেশের উপলব্ধ সমস্ত উপায়ে সেই প্রতিরোধ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে অবস্থান

সৌদি উপমন্ত্রী এই দুটির মধ্যে যোগসূত্র টানার পর ইসলামাবাদ তেহরানকে হুথিদের বিষয়ে কোনো ‘সতর্কবার্তা’ দিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজি আইএসপিআর জানান যে, উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং পরিস্থিতি শান্ত করার একাত্তরটি উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সামরিক মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, পক্ষের সাথে সমস্ত মিথস্ক্রিয়া এবং আলোচনা উত্তেজনা হ্রাসের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত প্রসঙ্গে লেফট্যানেন্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, আপনারা এই সংঘাতে একটি সাইনাসয়েডাল (সাইন তরঙ্গের মতো ওঠানামা করা) বা চক্রাকার প্যাটার্ন দেখতে পেয়েছেন, যেখানে সংঘাত কমে আসার পর বিশৃঙ্খলার এজেন্টরা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরিস্থিতি আবার ওপরে নিয়ে যায়। তিনি দাবি করেন যে, এ ধরনের উত্তেজনা এই সংঘাতের সমাধান করবে না।

তিনি বলেন, আপনি এটিকে হুথিদের দিকে প্রসারিত করুন বা অন্য কোথাও প্রসারিত করুন, এতে কোনো লাভ হয় না। এটি কেবল তাদেরই সেবা করে যারা এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। ডিজি আইএসপিআর আরও বলেন, একই সাথে পাকিস্তান খুব শক্তিশালী সংকেত দিচ্ছে যে এই যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে এবং আমরা সৌদি আরব ও হারামাইন শরিফাইনের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।

তিনি মন্তব্য করেন, এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে, সে সামনে থাকুক কিংবা পেছনে।

জোট গঠনের নেপথ্যে ইরান বা ইসরায়েলকে প্রতিহত করার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এমন রিপোর্টের বিষয়ে লেফট্যানেন্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, এই চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই। তবে তিনি যোগ করেন, এটি অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত হয়েছে। তাই যে কোনো শক্তি এই শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করবে, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মুখোমুখি হবে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলের ওপর হুমকির বিষয়ে ডিজি আইএসপিআর উল্লেখ করেন যে, রিয়াদ একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে, যেখানে একজন পাকিস্তানি নৌ কর্মকর্তা এর উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘আমাদের একে অপরকে আক্রমণ করা বন্ধ করতে হবে’

সৌদি আরব এবং মুসলিম জাহানের উদ্দেশে তার বার্তা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে লেফট্যানেন্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, উল্লম্ব বা অনুভূমিকভাবে এই সংঘাতগুলোকে বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে কোনো দেশেরই কোনো লাভ নেই। তিনি বলেন, আমাদের একে অপরকে আক্রমণ করা বন্ধ করতে হবে। মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান সব পক্ষকে একই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে বলে তিনি জানান।

লেফট্যানেন্ট জেনারেল চৌধুরী বলেন, যদি আমরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হই এবং সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি, তবে মক্কা জোটের যৌথ প্রতিরোধের এই হাতিয়ারটি অবশ্যই কার্যকর হবে, যেমনটি এখন কার্যকর হচ্ছে।

মক্কা চুক্তি নিয়ে উত্থাপিত সংশয় সম্পর্কে তিনি বলেন, সমালোচকরা কেবল তারাই যাদের এই জোট নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাই সমালোচনা করাটাই তাদের কাজ।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, তারা হুট করে একদিনে এই সিদ্ধান্ত নেয়নি। এই সম্পর্ক অনেক পুরোনো। জোটের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিকশিত হওয়াকে তিনি অসাধারণ বলে অভিহিত করেন।

জোটের সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে সামরিক মুখপাত্র জানান, যৌথ প্রতিরোধের নীতিতে বিশ্বাসী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্য ধারণ করে এমন অন্যান্য দেশের জন্য জোটের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। মিশর ও সিরিয়ার যোগদানের আগ্রহের প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এই তিন দেশের রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং সামরিক নেতৃত্বের ওপর ন্যস্ত।

উল্লেখ্য, এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের অধীনে একটি জরুরি বৈঠকে মিলিত হয় এবং কিংডমে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা মোতায়েন করতে সম্মত হয়। যদিও এই বিবৃতিতে সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকির নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির উদ্দেশ্য হলো যৌথ প্রতিরোধ জোরদার করা এবং চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ডিজি আইএসপিআর জানিয়েছিলেন যে, সৌদি আরব রক্ষায় পাকিস্তান যেকোনো প্রান্তে যেতে প্রস্তুত এবং কিংডমের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিশ্রুতি শর্তহীন। একই সঙ্গে পাকিস্তান বারবার স্পষ্ট করে আসছে যে এই জোটটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যই এটি গঠিত হয়েছে।