ঢাকাসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল নিয়মের মধ্যে আনতে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এ কার্যক্রমে প্রতিটি ই-রিকশার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। নিবন্ধন প্লেটের জন্য আলাদা করে দিতে হবে আরও ১ হাজার টাকা। তবে আপাতত চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না।
রবিবার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলনকক্ষে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা-২০২৬’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
নতুন বিধিমালা প্রকাশের পর ই-রিকশাচালকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, একসাথে সব রিকশার নিবন্ধন দেওয়া হবে না; ধাপে ধাপে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। একইসাথে নিবন্ধনের বাইরে থাকা ই-রিকশা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও থাকবে। এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের কিছুটা সময় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মীর শাহে আলম বলেন, বিধিমালা প্রকাশের সাথে সাথে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করে কেউ যেন রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে, সে জন্য সবাইকে অনুরোধ করব। আপাতত যারা যেভাবে রিকশা চালাচ্ছেন, তারা নিয়ম মেনে চালাবেন। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে এবং অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার রিকশা চলাচলে আটটি আলাদা জোন
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে আটটি জোন গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুই সিটির প্রতিটিতে চারটি করে জোন থাকবে। জোন অনুযায়ী রিকশার রংও আলাদা হবে। ফলে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।
প্রতিটি জোনে কতসংখ্যক রিকশা চলবে, তা ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে ঠিক করবে। যানজট এড়াতে কোন এলাকায় কত রিকশা রাখা সম্ভব, তা বিবেচনায় নিয়েই এ সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিধিমালায় বাস চলাচল করে এমন সড়কে ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে। তবে কোন সড়কে কীভাবে এ বিধান কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে নেওয়া হবে।
নিবন্ধন ও নবায়নের নিয়ম
প্রতিটি ই-রিকশার নিবন্ধনের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং নিবন্ধন প্লেটের জন্য আরও ১ হাজার টাকা দিতে হবে। নিবন্ধন প্রতি বছর নবায়ন করতে হবে। তবে বার্ষিক নবায়ন ফি কত হবে, তা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি।
নিবন্ধিত রিকশার নম্বর, মালিকের পরিচয়, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং চলাচলের জন্য নির্ধারিত জোনের তথ্য থাকবে কিউআর কোডে। চালকের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আপাতত পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা রাখা হবে।
চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স এখনই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। নিবন্ধন কার্যক্রম কিছুটা এগোনোর পর এ বিষয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। পরবর্তী সময়ে চালকদের লাইসেন্সের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বুয়েটের নকশায় আনতে হবে ই-রিকশা
নিবন্ধন পাওয়ার আগে বর্তমানে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। নকশার সাথে সামঞ্জস্য আনার পরই এসব যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন ই-রিকশা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান রিকশার কাঠামো সংশোধনের পাশাপাশি উৎপাদনকারীদেরও নির্ধারিত নকশা মেনে যানবাহন তৈরি করতে হবে।
চার্জিং ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিধিমালায় নির্দেশনা রয়েছে। নির্দিষ্ট স্থানে ই-রিকশার চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে রিকশা চার্জের ব্যবস্থা করতে পারবে- এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রিকশা চার্জ দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা এসব কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করবেন।
এক মাস পর অগ্রগতি জানাবে সরকার
ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম কত দিনে শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি প্রতিমন্ত্রী। তবে কার্যক্রম শুরুর এক মাস পর সাংবাদিকদের সাথে বসে অগ্রগতি তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন তিনি। তখন কতটি রিকশা নিবন্ধিত হয়েছে এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানানো হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো আইনগত নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করছে। সিটি করপোরেশন আইন-২০০৯ সংশোধনের মাধ্যমে এসব যানবাহন নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। ওই আইনের ১২০ ধারার আলোকে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় বিধিমালাটি কার্যকর হবে। পৌরসভা এলাকায় ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের পর সেখানে আলাদা বিধিমালা জারি করা হবে বলে জানান তিনি।
ই-রিকশার ভাড়া নির্ধারণের বিষয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, মালিকপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন আলোচনা করে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ঠিক করবে। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার চেষ্টা করা হবে।


