রান্নার গ্যাসের খরচ কমাতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের রান্নায় কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস বদলালেই অপ্রয়োজনীয় গ্যাসের ব্যবহার অনেকটা কমানো সম্ভব। যেমন, পাত্রের মাপ অনুযায়ী আগুনের শিখা ঠিক রাখা, রান্নার সময় ঢাকনা ব্যবহার করা কিংবা বার্নার নিয়মিত পরিষ্কার করা। এসব ছোট বিষয় অনেকেই গুরুত্ব দেন না, অথচ গ্যাস সাশ্রয়ে এগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলার সঠিক ব্যবহার এবং রান্নার পরিকল্পনা আগে থেকে করে রাখলে জ্বালানির অপচয় কমানো যায়। তাহলে কী কী নিয়ম মেনে চললে সিলিন্ডারের গ্যাস তুলনামূলক বেশি দিন ব্যবহার করা সম্ভব? জেনে নিন ১২টি কার্যকর কৌশল।
সিলিন্ডারের গ্যাস সাশ্রয় করতে যা করবেন
১. শিখার রং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন
এলপিজি চুলায় স্বাভাবিকভাবে নীল শিখা দেখা যায়। কিন্তু আগুন হলুদ বা কমলা হলে বার্নারে ময়লা জমা কিংবা বাতাসের সরবরাহে সমস্যা থাকতে পারে। এমন অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে চুলা পরীক্ষা করান।
২. বার্নারের ছিদ্র পরিষ্কার রাখুন
রান্নার সময় খাবারের কণা ও তেল বার্নারে জমে যেতে পারে। এতে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। তাই চুলা ঠান্ডা হওয়ার পর নির্দেশনা অনুযায়ী বার্নার পরিষ্কার করুন। পরিষ্কারের পর সেটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে ব্যবহার করুন।
৩. পাত্রের মাপ অনুযায়ী আগুন জ্বালান
ছোট পাত্রে বড় শিখা ব্যবহার করলে আগুনের তাপ পাত্রের চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্যাস খরচ হতে পারে। তাই রান্নার পাত্রের তলার আকার অনুযায়ী আগুনের মাত্রা ঠিক করুন।
৪. খাবার সেদ্ধ হলে আঁচ কমিয়ে দিন
রান্নার শুরুতে বেশি তাপের প্রয়োজন হতে পারে। তবে খাবার ফুটে ওঠার পর অনেক ক্ষেত্রে কম আঁচেই রান্না সম্পন্ন করা যায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শিখার মাত্রা কমিয়ে রাখুন।
৫. চুলা জ্বালানোর আগেই রান্নার প্রস্তুতি নিন
রান্না শুরু করার পর সবজি কাটা, মসলা বাটা বা অন্যান্য উপকরণ খোঁজার কারণে চুলা অকারণে জ্বলতে পারে। এ ধরনের অপচয় এড়াতে রান্নার আগে প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত করে রাখুন।
৬. রান্নার সময় পাত্রের মুখ ঢেকে রাখুন
পাত্রে ঢাকনা ব্যবহার করলে তাপ ও বাষ্প ভেতরে আটকে থাকে। ফলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হতে পারে এবং রান্নার সময় কম লাগে। এতে গ্যাসের ব্যবহারও কমানো সম্ভব।
৭. ভেজা পাত্র চুলায় বসাবেন না
রান্নার আগে পাত্রের নিচের অংশ ভালোভাবে মুছে নিন। পাত্রের গায়ে পানি লেগে থাকলে তা শুকাতে অতিরিক্ত তাপ ব্যয় হয়। তাই শুকনো পাত্র ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
৮. ফ্রিজের খাবার গরম করার আগে পরিকল্পনা করুন
ফ্রিজে রাখা খাবার গরম করার আগে নিরাপদ উপায়ে কিছুটা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসতে দিন। এতে খাবার গরম করতে কিছুটা কম সময় লাগতে পারে। তবে রান্না করা বা পচনশীল খাবার দীর্ঘক্ষণ বাইরে ফেলে রাখবেন না।
৯. রান্নায় প্রেসার কুকার কাজে লাগান
ডাল, মাংস ও অন্যান্য শক্ত খাবার দ্রুত রান্না করতে প্রেসার কুকার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় রান্নার সময় কমতে পারে। ফলে গ্যাসও সাশ্রয় হয়। তবে কুকারের সঠিক ব্যবহার ও নিরাপত্তানির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
১০. রান্না শেষ হলেই চুলা বন্ধ করুন
অনেক সময় রান্নার কাজ শেষ হওয়ার পরও চুলা জ্বালিয়ে রাখা হয়। আবার রান্নার মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি নিলেও আগুন বন্ধ করা হয় না। এসব অভ্যাস পরিহার করুন। প্রয়োজন শেষ হলে চুলার নব বন্ধ করে দিন।
১১. চুলার আশপাশে ময়লা জমতে দেবেন না
চুলার ওপর তেল, খাবারের অংশ ও অন্যান্য ময়লা জমলে বার্নারের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। তাই নিয়মিত চুলা ও রান্নার জায়গা পরিষ্কার রাখুন। বার্নারের ছিদ্র পরিষ্কারের সময় এমন কিছু ব্যবহার করবেন না, যাতে ছিদ্রের আকার বা গঠন নষ্ট হয়।
১২. গ্যাস লিকেজের লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হোন
সিলিন্ডার, রেগুলেটর কিংবা সংযোগস্থল থেকে গ্যাস বের হওয়ার গন্ধ পেলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে। নিরাপদে সম্ভব হলে গ্যাসের ভালভ বন্ধ করুন। এ সময় আগুন জ্বালানো, ম্যাচ বা লাইটার ব্যবহার কিংবা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু-বন্ধ করা যাবে না। নিরাপদ হলে দরজা-জানালা খুলে দিন এবং দ্রুত বাইরে চলে যান। বাইরে থেকে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের সহায়তা নিন।
সচেতনতাই গ্যাস সাশ্রয়ের সহজ উপায়
সিলিন্ডারের গ্যাস কত দিন চলবে, তা নির্ভর করে পরিবারের রান্নার পরিমাণ, চুলার অবস্থা এবং ব্যবহারের ধরনের ওপর। তাই নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললেই অর্ধেক গ্যাস সাশ্রয় হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে রান্নার সময় অপ্রয়োজনীয় আঁচ এড়িয়ে চলা, পাত্র ঢেকে খাবার তৈরি করা, বার্নার পরিষ্কার রাখা এবং আগে থেকে রান্নার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো অভ্যাস গ্যাসের অপচয় কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে সিলিন্ডারের ব্যবহার আরও সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের রান্নার খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।


