...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

রেলের ই-টিকেটিং

সহজের সরল জালিয়াতি

সরকারের অর্থ লোপাটের সাথে কেটেছে যাত্রীর পকেট

এনায়েত শাওন
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:২২ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:২৬
Shares
সহজের সরল জালিয়াতি

গ্রাফিক্স: টাইমস টুডে

বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিংয়ের সেবা প্রদানের সাথে জড়িত সহজ লিমিটেড জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের অর্থ লোপাটের সাথে যাত্রীদের পকেট থেকেও টাকা হাতিয়েছে নিয়েছে। এসব কাজের সাথে সহজের রেলওয়ে মন্ত্রণালয়েরও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িয়েছেন। বিগত দুই অর্থ বছরের হিসাবে এসব গরমিল ধরা পড়লেও সহজ লিমিটেড বিগত ছয় বছরে ঠিক কি পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে সেটা খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে।

জানা গেছে, ইটিকেটিং থেকে অর্জিত আয়ের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে কম জমা, প্রদেয় ভ্যাটের হিসাবে গরমিল, সেবা বন্ধ রাখায় চুক্তির শর্ত মোতাবেক জরিমানা প্রদানে বিরত থাকা এমনকি অনুমোদিতভাবে টিকেট ফেরতের জন্য যাত্রীর পকেট কেটে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। সরকারের মহা হিসাব নীরিক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পরিচালিত এক আইটি অডিটে এসব জালিয়াতি ও ফাঁকির বিষয়গুলো উঠে আসে। বিগত ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর পরিচালিত নীরিক্ষার আপত্তি প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে বলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য মতে, টিকেট রিফান্ডের মাধ্যমে গ্রাহকের পকেট থেকে ৯কোটি টাকা, সেবা বন্ধ থাকায় চুক্তির শর্তমতে সহজের কাছে রেলওয়ের পাওনা প্রায় ১কোটি ৪০লাখ, বিক্রয়কৃত টিকেটের বিপরীতে ভ্যাট বাবদ পাওনা ৩০লাখের বেশি এবং টিকেটের প্রকৃত আয় থেকে রেলওয়েকে ৮কোটির ওপরে কম প্রদান করেছে সহজ লিমিটেড।

সার্বিক বিষয়ে জানতে সহজ ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার অযুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি তাদের জনসংযোগ সংস্থার সাথে কথা বলতে পরামর্শ দেন।

আপত্তি থেকে জানা গেছে, প্রাধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল) নিকট ই-টিকেটিং সিস্টেমের আওতাধীন ১৬৩টি স্টেশনের মাসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। প্রত্যেক স্টেশনের বিক্রয় প্রতিবেদন ও এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমাকৃত অর্থের হিসাব মিলিয়ে এসব গরমিল ধরা পড়ে। পাঁচ বছরের ওপর নিরীক্ষা পরিচালিত হলেও, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬সালের জুন পর্যন্ত হিসাবের গরমিল খুঁজে বের করা হয় নিরীক্ষায়। নিরীক্ষায় দুই বছরে ফাঁকি ধরা পরে কমলাপুরে ৪ কোটি ৭৬ লাখ, রাজশাহীতে ৯৬ লাখ ৬১ হাজার, চট্টগ্রামে ১ কোটি ৩ লাখ, কক্সবাজারে ৫ লাখ ২৮ হাজার, সিলেটে ৩১ লাখ ৪৪ হাজার, লালমনিরহাটে ৭ লাখ ৪২ হাজার, রংপুরে ১৮লাখ ৪হাজার, খুলনায় ৩২লাখ ৮হাজার, ময়মনসিংহে ১২ লাখ ৮১ হাজার ও দিনাজপুরে ২০ লাখ ৩৩হাজার টাকা। ই-টিকেটিংয়ের আয় থেকে রেলওয়েকে ৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ কম দিয়েছে সহজ।

অন্যদিকে, শুধু টিকেটের আয় থেকে রেলওয়ে কম ভাগ পেয়েছে তাই নয়। টিকেট বিক্রি থেকে সরকারের যে পরিমাণ ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর পাওয়ার কথা ছিল সে টাকাও ফাঁকি দিয়েছে সহজ লিমিটেড। এই অর্থের পরিমাণ ৩০লাখ ২৭হাজারের কিছু বেশি। এখানেও দুই বছরের হিসাবের ওপর নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি ২০১৮ সাল থেকেই সহজ ই-টিকেটিংয়ের কাজ করে আসছে। এর আগের ৬বছরে কি পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে তাও খুঁজে দেখার দাবি রাখে।

টিকেট বিক্রি বন্ধের তদন্ত দেড় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি

এদিকে রেলওয়ের সাথে সহজ লিমিটের চুক্তি মোতাবেক টিকেট বিক্রয় সেবা বন্ধ থাকলে সেজন্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা প্রদান করতে হয়। ২০২৫ আলের এপ্রিলে ১৩ ঘণ্টা ই-টিকেটিং সেবা বন্ধ থাকায় সেজন্য প্রায় ১কোটি ৩৯লাখ ৮৮হাজার টাকা জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেনি সহজ লিমিটেড। বরং রেলওয়ে এজন্য রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য দুটি আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দেড় বছরের বেশি সময়েও আলোর মুখ দেখেনি।

আপত্তিতে বলা হয়, রেলওয়ে পশ্চিমে ২০২৫সালের ৩এপ্রিল রাত ৯টা ১০মিনিট থেকে পরদিন ৪এপ্রিলের সকাল ১০টা ৪০মিনিট পর্যন্ত এবং রেলওয়ে পূর্বে ২০মিনিট পূর্ব থেকেই বন্ধ থাকে ই-টিকেটিং সেবা। চুক্তির বিশেষ শর্তের ৫নম্বর ধারা মতে দিন-রাত ২৪ঘন্টা ই-টিকেটিং সেবা চালু রাখতে হবে। কোনো ত্রুটির কারণে যদি এই সেবা বন্ধ থাকে তবে প্রতি কাউন্টার ও প্রতি ঘণ্টার জন্য ২০০০টাকা করে জরিমানা দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসাবে কাউন্টার ও পস মেশিন ২৬০টিসহ জরিমানার অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১কোটি ৩৯লাখ ৮৮হাজার।

সূত্র জানায়, রেলওয়ে জরিমানার টাকা আদায় করতে পত্র দিলেও সহজ লিমিটেড এক চিঠিতে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জানায়। এ প্রেক্ষিতে দুই অঞ্চলে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় রেলওয়ে। সেই ঘটনার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনও জমা পড়েনি এমনকি জরিমানার অর্থ আদায়ও হয়নি।

গ্রাহকের পকেটের টাকা সহজের থলিতে

অনুমোদন ছাড়াই রেলযাত্রীর পকেটে কাটতে সহজকে পথ তৈরি করে দিয়েছে রেলওয়ে। অনলাইনে কাটা টিকেটে ফেরত দেওয়া বাবদ যাত্রী প্রতি ১৫টাকা নিজেদের থলিতে ভরেছে সহজ লিমিটেড। যেখানে অনলাইনে টিকেট কাটতে একজন গ্রাহককে সহজ লিমিটেডকে দিতে হয় ৬.৫০টাকা সেখানে টিকেট ফেরত দিতে  গ্রাহকের কাছ থেকে ২০২৩ সাল থেকে সহজ নেয় ১৫টাকা করে।

আপত্তির তথ্য মতে, একজন গ্রাহক অনলাইনে টিকেট কাটতে ২০টাকা খরচ করতে হয়। এরমধ্যে ১৩.৫টাকা ভ্যাট্ম ট্যাক্স ও পেমেন্ট গেটওয়ের চার্জ হিসেবে এবং সহজ এই সেবার জন্য পায় ৬.৫টাকা। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৬সালের জুলাই পর্যন্ত ৪০মাসে সর্বমোট ৩৭লাখ ৬২হাজার ৮৪৮টি টিকেট ফেরত দেওয়া হয়, যার সিটের সংখ্যা ৬০লাখ ২হাজার ৪৩৫টি। এর সাথে জড়িত অর্থের পরিমাণ ২০৭কোটি ৪২লাখ ৩৫হাজার ৮৯৯টাকা। এই টাকা হতে ১৫টাকা করে ৯কোটি ৩৬হাজার ৪৭৩টাকা সহজ লিমিটেড সার্ভিসা চার্জবাবদ নিজেদের পকেটে পুরে নিয়েছে। 
ব্যাখ্যায় রেলওয়ের মহাপরিচালক ও এর অর্থবিভাগের অনুমোদন নেওয়ার কথা জানায় সহজ।

পিপিআরের শর্তানুযায়ী মহাপরিচালক বা তার অধস্তন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) এর অনুমোদন মন্ত্রণালয়ের বিকল্প বা সমতূল্য নয়। কারণ চুক্তির শর্তে উল্লেখ করা ছিল ক্যানসেল টিকেটস বা রিফান্ডেড টিকেটস কোনো পেমেন্টের ভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে সহজ লিমিটেড সুস্পষ্টভাবে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে রেলওয়ের মহাপরিচালকের দফতরের সহায়তায় জালিয়াতি করে গ্রাহকের পকেট কেটেছে।

সার্বিক বিষয়ের ওপর রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেও এবিষয়ে মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।