...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

সর্বজনীন পেনশনে কিস্তি জমা দিচ্ছেন না ৯৫ শতাংশ গ্রাহক

সর্বজনীন পেনশনে কিস্তি জমা দিচ্ছেন না ৯৫ শতাংশ গ্রাহক

Times Today
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ভোর রাত ৫:৩৮ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:১৭
Shares
সর্বজনীন পেনশনে কিস্তি জমা দিচ্ছেন না ৯৫ শতাংশ গ্রাহক

এনায়েত শাওন : 

জীবন সায়াহ্নে আর্থিক নিরাপত্তার আশায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে, তা যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুবর্ণ সুযোগ আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগ আস্থা ও প্রচার-প্রচারণার অভাবে গতি হারিয়েছে। ফলে মোট গ্রাহকের ৯৫ শতাংশ স্কিম গ্রহণকারীই এখন মাসিক টাকা জমা দিচ্ছেন না, এমনকি নতুন গ্রাহকের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদাসীনতা ও বর্তমান নতুন সরকারের উদ্যোগের অভাবে ধুঁকছে জনবান্ধব এই কর্মসূচি।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর এক বছরের মাথায় শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর কর্মকাণ্ডের গতিতে ভাটা পড়ে। ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় পেনশন স্কিমের কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়বে না জানানো হলেও তা গ্রাহকের মধ্যে পর্যাপ্ত আস্থা জন্মাতে পারেনি। বরং ক্রমহ্রাসমান ধারা অব্যাহত আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকারের সময়ও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ, সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা, নতুন কিছু গ্রহণ করায় জনগণের অনীহা সত্ত্বেও গতিশীল হয় কর্মসূচি হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রচার ও প্রচারণার অভাবের কারণে এই কর্মসূচির কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি ভাটা পড়ে। একই সঙ্গে বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় ১২ দিন অতিবাহিত হলেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ না দেওয়ায় কর্মকাণ্ডের গতি নেই বললেই চলে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কে দায়িত্বগ্রহণ করবেন তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ফলে গ্রাহক ও কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা।

কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের  আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনীন পেনশন স্কিম কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ১৮ বছরের বেশি বয়সী যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ৬০ বছর বয়সে না পৌঁছানো পর্যন্ত মাসিক কিস্তি পরিশোধ করে অবসরজীবনের সময় পেনশন-সুবিধা পেতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এরই অংশ হিসেবে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা নামের চারটি আলাদা পেনশন কর্মসূচি চালু করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর মুখ থুবড়ে পড়ে। 

আরও জানা যায়, গত দুই বছর আট মাসে পেনশন স্কিমের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ২৯১ জন। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার ৭০৯ জন। অনিয়মিত গ্রাহক বা কিস্তির টাকা জমা দিচ্ছেন না ৩ লাখ ৫৬ হাজার ১৪ জন। অর্থাৎ ৯৪.৩ শতাংশ গ্রাহকই মাসিক কিস্তির টাকা জমা দিচ্ছেন না। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি কিস্তি জমায় অনাগ্রহী সমতা স্কিমের আওতায় দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের ব্যক্তিগণ। প্রায় ৯৮ শতাংশ গ্রাহকই মাসিক কিস্তি পরিশোধ করছেন না। এই স্কিমের গ্রাহক সংখ্যা মোট ২ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৬ জনের মধ্যে ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৭০ জনই অনিয়মিত হয়ে গেছেন। একইভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বা স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষা স্কিমের ৬৪ হাজার ৯২১ জনের মধ্যে ৫৭ হাজার ৪৯৩ জনই মাসিক কিস্তি পরিশোধ করছেন না, যা শতকরা ৮৮.৫ শতাংশ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মচারীদের জন্য প্রগতি স্কিমের ৬৯.৫ শতাংশ গ্রাহক অনিয়মিত। ২৪ হাজার ৫৭৫ জনের মধ্যে ১৭ হাজার ৯১ জন কিস্তি পরিশোধ থেকে বিরত আছেন। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাস স্কিমের এক হাজার ৬৯ জনের মধ্যে ৬৬০ জন কিস্তি পরিশোধ করছেন না, যা শতকরা ৬১.৭ শতাংশ। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যপক অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে এক প্রকার আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির প্রতি মানুষের আগ্রহ তলানিতে ঠেকেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এই উদ্যোগ পরবর্তী সরকারের সময় চলমান থাকবে কিনা বন্ধ করে দেওয়া হবে তা নিয়ে গ্রাহকদের মাঝে রয়েছে শঙ্কা। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির প্রচার ও প্রচারণায় নেই কোনো উদ্যোগ, ফলে গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে না বরং দিনকে দিন তা কমছে। যারা পেনশন স্কিম গ্রহণ করেছিলেন তারাও নিয়মিত পরিশোধ করছে না।

এ বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান কবিরুল ইজদানী খান টাইমস টুডেকে বলেন, আমি যখন চেয়ারম্যান হিসেবে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে ছিলাম তখন কর্মকাণ্ড গতিশীল ছিল কিন্তু পরবর্তী সরকারের সময় কমর্কাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় এই অবস্থা। 

সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চালু হওয়া এই কর্মসূচি নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। ফলে ঊর্ধ্বতন আমলাদের পক্ষ থেকে স্কিমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) চাপ প্রয়োগ করা হতো। তারা প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের চাপ দিতেন, ফলে সরকার পতনের আগের মাস জুলাই পর্যন্ত এক বছরে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৭ জন গ্রাহক স্কিম গ্রহণ করেন। কিন্তু সরকার পতনের পর থেকে এ ধারায় ছন্দপতন ঘটে। বিগত ২০ মাসে ৫ হাজার ৭৫৯ জন।

পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে যাত্রা শুরুর মাসে স্কিম গ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৮৩৬ জন, সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার ১০৫, অক্টোবরে এক হাজার ২৬৫ জন, নভেম্বরে এক হাজার ১৪৪ জন, ডিসেম্বরে এক হাজার ১৪৭। সরকারের তাগাদায় ২০২৪ সালে বাড়তে থাকে গ্রাহক সংখ্যা। জানুয়ারিতে এক হাজার ২৭৭, ফেব্রুয়ারিতে ২ হজার ২৯১ জন, মার্চে ২৩ হাজার ১২ জন, এপ্রিলে ৬৩ হাজার ৭৮১ জন, মে মাসে এক লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৬ জন, জুন মাসে ৭২ হাজার ৫ জন, জুলাই মাসে ৩২ হাজার ৩৯৮ জন। এরপরই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্রাহক সংখ্যা নেমে আসে শতকের ঘরে। আগস্ট মাসে মাত্র ৯৪১ জন, সেপ্টেম্বরে ২৭৫ জন, অক্টোবরে ২০০ জন, নভেম্বরে ৩৮১ জন, ডিসেম্বরে ১৫৭ জন। একই ধারা ২০২৫ সালেও চলতে থাকে। এ বছর জানুয়ারি মাসে ২২৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১৪ জন, মার্চে ১৫২ জন, এপ্রিলে ১৫৩ জন, মে মাসে ২০৩ জন, জুন মাসে ৩০০ জন, জুলাই মাসে ২৩১ জন, আগস্ট মাসে ১৭২ জন, সেপ্টেম্বরে এক হাজার ৩৬৬ জন, অক্টোবর ২৭৯ জন, নভেম্বর  ২১২ জন এবং ডিসেম্বরে ১৬০ জন। চলতি বছরে প্রথম তিন মাসে ৭১৫ জন গ্রাহক স্কিম গ্রহণ করেছেন।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. মো. সুরাতুজ্জামান টাইমস টুডেকে বলেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই কর্মসূচিটি গৃহীত হয় কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এর দেখভাল করেনি। সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা ও নতুন কিছু গ্রহণের দ্বিধায় গ্রাহকদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে, ফলাফল আশানুরূপ নয়। বর্তমান সরকারের সময় এই কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এজন্য এই ভাটা পড়ার কারণগুলো খুঁজে বের করা হচ্ছে, যা আগামী বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থাপন করে নতুন করে শুরু করা হবে। যেহেতু ‘ট্রানজিশনাল’ সময় অতিক্রম করেছি এজন্য এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেসময় পেনশন স্কিমের গ্রাহক বৃদ্ধি করতে প্রশাসনকে চাপ দেওয়ার মাধ্যমে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ফলে সে সময়ে যারা গ্রাহক হয়েছিলেন, তারা এখন এই পেনশন কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।