...|...|...

লাইফস্টাইল

শীত এলেই কেন মনের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ নভেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৫:৫৫
Shares
শীত এলেই কেন মনের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়?

ছবি: সংগৃহীত

শীতের সকাল। জানালার বাইরে ঘন কুয়াশা, চারপাশে নীরবতা। বিছানার উষ্ণতা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করে না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। অথচ মনের ভেতর কোথায় যেন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা। কোনো বিশেষ কারণ নেই, তবু কিছুই ভালো লাগে না। প্রিয় কাজেও আগের মতো আনন্দ পাওয়া যায় না। কখনো মনে হয়, সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও কোথায় যেন কী একটা নেই।

এমন অনুভূতি অনেকের কাছেই পরিচিত। শীতের সময় কারও কারও মন খারাপ, একাকিত্ব কিংবা অকারণ শূন্যতার অনুভূতি বেড়ে যায়। কেউ এটিকে শীতের অলসতা ভাবেন, কেউ আবার নিছক মন খারাপ বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে শরীর ও মস্তিষ্কের কিছু পরিবর্তন, এমনকি বিশেষ ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও।

সূর্যের আলো কমলে বদলে যায় মনের ছন্দ

শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য কমে আসে। সূর্যের আলো পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। এই পরিবর্তন শুধু প্রকৃতিতেই নয়, মানুষের শরীর ও মনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

মানুষের শরীরের একটি নিজস্ব জৈবঘড়ি রয়েছে, যা ঘুম, জেগে থাকা, হরমোন নিঃসরণসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। সূর্যের আলো এই জৈবঘড়ি ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দিনের আলো কমে গেলে কারও কারও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসে। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয়, দিনের বেলায় ক্লান্তি লাগে এবং কাজে মনোযোগ কমে যেতে পারে।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদানেও প্রভাব পড়ে

মানুষের মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের কয়েকটি রাসায়নিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে সেরোটোনিন উল্লেখযোগ্য। এটি মেজাজ, ঘুম ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলোর পরিমাণের সাথে সেরোটোনিনের কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে। শীতকালে আলো কম পাওয়ার কারণে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে মন খারাপ, অবসাদ কিংবা বিষণ্নতার অনুভূতি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, অন্ধকারের সাথে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিন ঘুম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। শীতের দীর্ঘ রাত ও দিনের আলো কমে যাওয়ার কারণে কারও কারও মেলাটোনিন নিঃসরণের ছন্দ বদলে যেতে পারে। এর প্রভাবে অতিরিক্ত ঘুম, অবসাদ ও কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শীতের একাকিত্বও বাড়াতে পারে বিষণ্নতা

শীতের সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আসে। সকালে বাইরে বের হওয়ার অনীহা, সন্ধ্যার পর দ্রুত ঘরে ফিরে আসা কিংবা বন্ধু ও পরিচিতজনদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কমে যাওয়া- এসব কারণে সামাজিক যোগাযোগ সীমিত হতে পারে।

বিশেষ করে যারা আগে থেকেই একাকিত্বে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন মানসিক অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরে কাটানো, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং পছন্দের কাজ থেকে দূরে থাকাও মন খারাপের কারণ হতে পারে।

তবে শীত এলেই যে সবার মন খারাপ হবে, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে আবহাওয়া, জীবনযাত্রা, শারীরিক অবস্থা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আলাদা হতে পারে।

শীতকালীন বিষণ্নতা কী?

শীতকালে কিছু মানুষের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ নিয়মিতভাবে দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা এসএডি (Seasonal Affective Disorder) বলা হয়। এটি এক ধরনের বিষণ্নতা, যার লক্ষণ সাধারণত বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে শীতকালে লক্ষণ বাড়ে এবং বসন্ত বা গ্রীষ্মে কমে আসে।

এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ অনুভব করতে পারেন। আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন, সেগুলোর প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। অতিরিক্ত ঘুম, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া এবং সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

তবে শীতকালে কয়েক দিন মন খারাপ থাকলেই সেটিকে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বলা যাবে না। লক্ষণের স্থায়িত্ব, তীব্রতা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা রোগ নির্ণয় করেন।

শীতের বিষণ্নতা কাটাতে কী করবেন?

শীতের সময় মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন উপকারী হতে পারে। প্রতিদিন দিনের আলোয় কিছু সময় কাটানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা এবং ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা এ ক্ষেত্রে সহায়ক।

এ ছাড়া পরিবার ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখা, পছন্দের কাজে সময় দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় একা ঘরে বসে না থাকাও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। দিনের আলোয় বাইরে হাঁটার অভ্যাস শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে মন খারাপ বা শূন্যতার অনুভূতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, প্রায় প্রতিদিন দেখা দেয় কিংবা কাজ, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি বা চিকিৎসার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

মন খারাপকে অবহেলা নয়

শীতের কুয়াশা, ছোট দিন কিংবা দীর্ঘ রাত প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে কারও মনের ভেতর যদি দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা বা শূন্যতা তৈরি হয়, সেটিকে কেবল ঋতুর প্রভাব বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

কারণ, সব মন খারাপের পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণ থাকে না। কখনো শরীরের জৈবিক পরিবর্তন, কখনো একাকিত্ব, আবার কখনো মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতা এর পেছনে কাজ করতে পারে। তাই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, কাছের মানুষের সাথে কথা বলা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াই হতে পারে শীতের বিষণ্নতা সামলানোর প্রথম পদক্ষেপ।