...|...|...

অন্যান্য

মেনোপজ মানেই কি বিষণ্ণতা, কষ্ট ও মানসিক অস্থিরতা দূর করবেন যেভাবে

টাইমস টুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:০৩
Shares
মেনোপজ মানেই কি বিষণ্ণতা, কষ্ট ও মানসিক অস্থিরতা দূর করবেন যেভাবে

ছবি: এআই

জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য প্রক্রিয়া হলো মেনোপজ বা ঋতুনিবৃত্তি। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রতিটি নারীর জীবনেই এই পরিবর্তনটি আসে। তবে সচেতনতার অভাবে অনেকেই এই সময়ে চরম শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন। 

মেনোপজ কী?

সহজ কথায়, নারীর জীবনের যে পর্যায়ে মাসিক বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাকে মেনোপজ বলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, যদি কোনো নারীর টানা ১২ মাস (১ বছর) পিরিয়ড সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, তবে তাকে মেনোপজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে নারীদের মেনোপজ হয়ে থাকে।

কেন হয়? (মেনোপজের কারণ)

নারীদেহের প্রধান দুটি হরমোন হলো ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিম্বাশয় থেকে এই হরমোনগুলোর নিঃসরণ প্রাকৃতিকভাবেই কমে যেতে থাকে। একপর্যায়ে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং নারী মেনোপজে পৌঁছান।

এছাড়াও কিছু বিশেষ কারণে সময়ের আগেই মেনোপজ হতে পারে:
• অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু ও ডিম্বাশয় (Ovary) অপসারণ করলে।
• ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি দিলে।

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

মেনোপজ হুট করে হয় না। এর কয়েক বছর আগে থেকেই শরীরে নানা পরিবর্তন শুরু হয়, যাকে 'পেরিমেনোপজ' বলা হয়। এই সময়ে এবং মেনোপজের পরে প্রধান যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:
• হট ফ্ল্যাশ (Hot Flashes): কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে বুক, গলা ও মুখমণ্ডল প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠা এবং বুক ধড়ফড় করা।
• রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম: ঘুমানোর সময় হঠাৎ শরীর ঘেমে যাওয়া এবং এর ফলে ঘুম ভেঙে যাওয়া।
• মানসিক পরিবর্তন: হরমোনের ওঠানামার কারণে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, হুট করে কান্না পাওয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা (Depression)।
• অনিয়মিত পিরিয়ড: মেনোপজ হওয়ার আগে পিরিয়ডের রক্তপাতের পরিমাণ কমে বা বেড়ে যেতে পারে এবং সময়ের ব্যবধান অনিয়মিত হয়।
• শারীরিক পরিবর্তন: ত্বক ও যোনিপথ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পড়া এবং ওজন দ্রুত বেড়ে যাওয়া।
• হাড়ের দুর্বলতা: শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে, ফলে হাড় ক্ষয় (Osteoporosis) ও শরীরে ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে।

এই সময়ে করণীয় কী?

মেনোপজ কোনো রোগ নয়, তাই একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সঠিক জীবনযাত্রা ও সচেতনতার মাধ্যমে এই সময়টিকেও স্বস্তিদায়ক করে তোলা সম্ভব।
১. পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা:
• ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: দুধ, দই, ছানা, ছোট মাছ ও সবুজ শাকসবজি) বেশি খেতে হবে, যা হাড় মজবুত রাখে।
• খাবারে সয়াবিন, ডাল ও তৈলাক্ত মাছ রাখুন।
• অতিরিক্ত তেল, ঝাল, চর্বিযুক্ত খাবার এবং ক্যাফেইন (চা-কফি) এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো হট ফ্ল্যাশের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
২. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম:
• প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম বা ইয়োগা করুন। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি মানসিক চাপ কমাবে এবং ভালো ঘুমে সাহায্য করবে।
৩. মানসিক যত্ন ও পারিবারিক সাপোর্ট:
• এই সময়ে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে সঙ্গীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর মেজাজের পরিবর্তনকে খিটখিটে স্বভাব না ভেবে তাকে মানসিক সহযোগিতা দিন।
• নিজেকে একা না রেখে পছন্দের কাজের সাথে যুক্ত রাখুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ:
• লক্ষণগুলো যদি তীব্র আকার ধারণ করে এবং দৈনন্দিন জীবনে চরম ব্যাঘাত ঘটায়, তবে অবহেলা না করে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের (Gynecologist) পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকরা সাময়িকভাবে 'হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি' (HRT) বা অন্যান্য ওষুধ দিয়ে থাকেন।

মেনোপজ নারীর জীবনের কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সঠিক তথ্য জানা থাকলে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখলে মেনোপজের দিনগুলোকেও সুস্থ, প্রাণবন্ত ও কর্মক্ষম রাখা পুরোপুরি সম্ভব।