...|...|...

বিশ্ব

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্ষমতা হারালেন সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা ভুচিচ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:০৪
Shares
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্ষমতা হারালেন সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা ভুচিচ

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে আগাম সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন তিনি।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে এগিয়ে রয়েছে বলে প্রাথমিক ভোটের নমুনায় দেখা গেছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিয়ার ২৫০ আসনের সংসদে ভুচিচের দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) ১০৫টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন স্টুডেন্ট লিস্ট ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি গত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নির্বাচনের ফলের বিষয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে ভুচিচ বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরেছি।’

যেভাবে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
২০২৪ সালের ১ নভেম্বর সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, জবাবদিহি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আন্দোলনটি বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদে রূপ নেয়।

প্রায় দুই বছর ধরে চলা বিক্ষোভের পর আন্দোলনকারীরা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

নির্বাচনী প্রচারণায় আন্দোলনটির নেতৃত্ব দেন নোভি সাদের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক ইলিয়া সারদানোভিচ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণে আন্দোলনটি ব্যাপক সমর্থন লাভ করে।

অন্যদিকে, ভুচিচ আন্দোলনকারীদের ‘ব্লকার’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলেন।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
১৯৭০ সালে বেলগ্রেডে জন্ম নেওয়া ভুচিচ বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৯৩ সালে ভইস্লাভ শেশেলির নেতৃত্বাধীন উগ্র জাতীয়তাবাদী সার্বিয়ান র‌্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়।

১৯৯০-এর দশকে তার রাজনৈতিক বক্তব্যে জাতীয়তাবাদী অবস্থান স্পষ্ট ছিল। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার নয় দিন পর সার্বিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া তার একটি বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘একজন সার্বকে হত্যা করলে আমরা ১০০ মুসলিমকে হত্যা করব।’ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় রিপাবলিকা শ্রপস্কার সেনাবাহিনীর অবস্থানে সম্ভাব্য ন্যাটো হামলা নিয়ে বিতর্কের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।

ভুচিচের তৎকালীন রাজনৈতিক গুরু শেশেলিকে ১৯৯০-এর দশকে বলকান যুদ্ধের সময় অ-সার্বদের ওপর নিপীড়ন, নির্বাসন ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের ঘটনায় ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আপিল চেম্বার ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন।

পরবর্তী সময়ে সার্বিয়ান র‌্যাডিক্যাল পার্টিতে বিভক্তি দেখা দিলে ভুচিচ ও তোমিস্লাভ নিকোলিচ ২০০৮ সালে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন দলটি ইউরোপের মূলধারার রাজনীতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে।

সার্বিয়ার সাংবাদিক সাফেতা বিসেভাচ আলজাজিরাকে বলেন, দল প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ভুচিচের জনপ্রিয়তা নিকোলিচের তুলনায় কম ছিল। নিকোলিচকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি বলে মনে করা হতো। সে সময় ভুচিচ মূলত নতুন দলটির সংগঠক হিসেবে কাজ করতেন।

দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার বিস্তার
২০১২ সালে এসএনএস ক্ষমতায় আসে। দলটি দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ এবং আগের সরকারগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ব্যবসায়ী মিরোস্লাভ মিসকোভিচ ও তার ছেলে মার্কোকে আর্থিক অনিয়ম ও কর ফাঁকির সন্দেহে গ্রেফতার করা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তারা দুজনই খালাস পান এবং রাষ্ট্রকে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

সাংবাদিক বিসেভাচের মতে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ফল সীমিত থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে।

ভুচিচ ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০১৭ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তার মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল।

তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের চাপে তিনি সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন এবং আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। দেশটির সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও মেয়াদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভুচিচ তার দল ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ধরে রেখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিসেভাচ বলেন, ‘তিনি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সেগুলোর খুব কমই পূরণ করেছেন। তবে এর মধ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।’

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ
২০১২ সালে ভুচিচের দল ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর সার্বিয়ার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের উদ্ধৃত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বেকারত্বের হার ২৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।

২০১২ সালে সার্বিয়ায় বার্ষিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ইউরো। ২০২৪ সালে তা বেড়ে রেকর্ড ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়ায়। এ সময়ে দেশটিতে আধুনিক মহাসড়কের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কও নির্মিত হয়েছে।

তবে মজুরি বাড়লেও জীবনযাত্রার মান সেই অনুপাতে উন্নত হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি ঋণও সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দুস্কো রাদোসাভলিয়েভিচ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কেবল নাগরিকদের ন্যায্য ক্ষোভ প্রকাশের একটি মাধ্যম তৈরি করে দিয়েছে।’

ভুচিচের শাসনামল সম্পর্কে তিনি বলেন, গত এক দশকে ‘সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি এবং সেগুলোকে ধ্বংস করার’ প্রবণতা দেখা গেছে।

রাদোসাভলিয়েভিচের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের মূল দায়িত্ব পালনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারিতে বেশি সময় ব্যয় করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার জায়গা সংকুচিত হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের নির্বাচনী সাফল্য তাই কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষেরও প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।