...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

শত বছর পর বলিভিয়ায় নতুন প্রজাতির বিড়ালের সন্ধান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:২৪
Shares
শত বছর পর বলিভিয়ায় নতুন প্রজাতির বিড়ালের সন্ধান

বলিভিয়ার বনাঞ্চলে পাওয়া ছোপ ছোপ দাগযুক্ত ছোট একটি বন্য বিড়ালকে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাণীটির স্বতন্ত্র পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। নতুন প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে লেপার্ডাস তিলকায়ো (Leopardus tilcayo)।

গৃহপালিত বিড়ালের কাছাকাছি আকারের এই প্রাণীটি এতদিন বিজ্ঞানীদের নজরের বাইরে ছিল। শরীরে থাকা দাগ ও ডোরার কারণে এটিকে অন্য কয়েকটি বন্য বিড়ালের সাথে একই প্রজাতির বলে মনে করা হতো। নতুন জিনগত গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে, এটি স্বতন্ত্র একটি প্রজাতি।

বলিভিয়ার লা পাজের ইউনিভার্সিদাদ মেয়র দে সান আন্দ্রেসের গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারুনজ বলেন, বিশ্বের জন্য নতুন একটি প্রজাতি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি বলেন, নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের জন্য সবসময় দুর্গম দ্বীপ, আগ্নেয়গিরি বা গভীর সমুদ্রে যেতে হয় না।

নতুন প্রজাতি শনাক্তের সূত্রপাত হয় বলিভিয়ার একটি উদ্ধারকেন্দ্রে থাকা ১০ বছর বয়সী একটি বিড়ালকে ঘিরে। প্রাণীটির ডাকনাম দেওয়া হয়েছে ‘টিগ্রিনো’।

নোগালেস-আস্কারুনজ অভয়ারণ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় প্রথম প্রাণীটির কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা এটিকে বন থেকে উদ্ধার করে প্রথমে গৃহপালিত বিড়ালের বাচ্চা মনে করেছিলেন। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর আচরণ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায়, এটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়াল নয়।

এরপর বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রাণীটির জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা শুরু করা হয়। জীবিত প্রাণী এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা থেকে সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণ করে টাইগার ক্যাটদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করেন গবেষকরা।

ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের সংরক্ষণ জিনতত্ত্ববিদ এদুয়ার্দো এইজিরিক বলেন, এই প্রাণী সম্পর্কে রেকর্ড ও ছবি খুবই কম ছিল। এমনকি জাদুঘরেও পর্যাপ্ত নমুনা পাওয়া যায়নি। ফলে প্রাণীটি অনেকটা সবার অগোচরেই থেকে গিয়েছিল।

কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এতদিন টাইগার ক্যাটের প্রজাতি তিনটি বলে ধারণা করা হলেও নতুন গবেষণায় এর সংখ্যা পাঁচটি হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে সদ্য শনাক্ত বলিভিয়ার টিলকায়ো ক্যাট।

দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় ছোট আকারের এসব বন্য বিড়ালকে টাইগার ক্যাট, টিগ্রিনা বা অনসিলা নামে ডাকা হয়। এদের শরীরে ছোপ ও ডোরার মিল থাকায় এক প্রজাতির সঙ্গে অন্য প্রজাতিকে আলাদা করা বিশেষজ্ঞদের জন্যও কঠিন।

সম্প্রতি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি টাইগার ক্যাট প্রজাতি স্বীকৃত ছিল উত্তরাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট বা অনসিলা (Leopardus tigrinus) এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট (Leopardus guttulus)। পরে ক্লাউডেড টাইগার ক্যাট (Leopardus pardinoides) কেও পৃথক প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন প্রজাতি শনাক্ত করা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো প্রাণীর সঠিক পরিচয়, বিস্তৃতি ও আবাসস্থল সম্পর্কে জানা না থাকলে তার জন্য কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন রিসার্চ ইউনিটের সহগবেষক ক্যারোলিন সার্টর বলেন, নতুন প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার পর এখন এর বিস্তৃতি, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য এবং বন্য পরিবেশে কী ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও অবৈধ শিকারের কারণে টাইগার ক্যাটগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নতুন প্রজাতিটির অবস্থান ও সংখ্যা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে এর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

এই আবিষ্কার বন্য বিড়ালের শ্রেণিবিন্যাসেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। গৃহপালিত বিড়াল থেকে শুরু করে বাঘ, সিংহসহ সব জীবিত বিড়াল প্রজাতিই ফেলিডি (Felidae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪১টি প্রজাতি স্বীকৃত। নতুন গবেষণা ও টাইগার ক্যাটের একাধিক স্বতন্ত্র প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার ফলে স্বীকৃত প্রজাতির সংখ্যা ৪৪ বা ৪৫-এ পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামসের স্তন্যপায়ী প্রাণী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কিচেনার বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দাগযুক্ত বিড়ালগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে জটিলতার কারণ। তবে পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের বন্য প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ বাড়ায় এই জটিলতা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে।