রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা মামলায় আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হত্যার আগে ধর্ষণ ও বিভিন্ন স্থানে জখমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের কোনো আবেদন না থাকায় বোঝা যায়, সোহেল স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছে। স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না।
এদিন সকালে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আনা হয়। পরে তাদের আদালতের মহানগর হাজতখানায় রাখা হয়।
এ ছাড়া, মেয়ের হত্যার রায় শুনতে আদালতে এসেছেন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। সকালে ঢাকা মহানগর আদালত প্রাঙ্গণে তাকে দেখা যায়। রায় ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে।
এর আগে, গত ৪ জুন এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের এ দিন ধার্য করেন।
এর মধ্য দিয়ে নৃশংস এ ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে বিচার শেষ পর্যায়ে পৌঁছাল। মামলা দায়েরের পর ৪ দিনের মাথায় চার্জশিট দাখিল, অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ সব ক্ষেত্রেই ছিল দ্রুতগতি। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে যাওয়ার নজির দেশে খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন, বিচার শুরু ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বাসায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মহল থেকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস দেওয়া হয়।
ঘটনার দিনই প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই সাথে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।
পরদিন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানাকে প্রধান আসামি এবং স্বপ্না আক্তারসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
তদন্ত চলাকালে ডিএনএ ও ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্তকারী সংস্থা। তদন্ত শেষে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।
অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
পরে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান। গত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।
৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। স্বপ্না আক্তারও নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।
গত ৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত ও মামলার অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কসহ পুরো বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত দ্রুত বিচারিক অগ্রগতি বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


