ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা। পারমাণবিক বিক্রিয়া ছাড়াই বিশাল বিস্ফোরণ ও তীব্র বায়ুচাপে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম এই অস্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে এখন কৌতূহল বাড়ছে।
ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) ব্যবহারের কথা ভাবছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। ‘মাদার অব অল বোম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত এই অস্ত্র বিশাল বিস্ফোরণ, তীব্র বায়ুচাপ ও ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতার জন্য পরিচিত।
১৫ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনায় অস্ত্রটি থাকতে পারে। তবে রয়টার্স তথ্যটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। অস্ত্রটি ব্যবহারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তাও প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
কীভাবে কাজ করে এই বোমা
এমওএবি মূলত একটি বড় আকারের, উচ্চ বিস্ফোরকনির্ভর প্রচলিত বোমা। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো এতে নিউক্লিয়ার বিভাজন বা সংযোজন ঘটে না। প্রচলিত বিস্ফোরকের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অল্প সময়ে বিপুল শক্তি নির্গত হয়।
বিস্ফোরণের সময় দ্রুত প্রসারিত গরম গ্যাস আশপাশের বাতাসে তীব্র চাপ তৈরি করে, যা শক্তিশালী ব্লাস্ট ওয়েভ বা বিস্ফোরণ-তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গে মানুষ আহত হতে পারে, ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য স্থাপনা ধ্বংস হতে পারে।
অস্ত্রটির বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে আঘাত করার জন্য নয়; বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণের প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। ফলে উন্মুক্ত এলাকায় থাকা জনবল, সরঞ্জাম ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিসর নির্ভর করে ভূপ্রকৃতি, স্থাপনার ধরন, বিস্ফোরণের অবস্থানসহ নানা বিষয়ের ওপর। তাই শুধু বোমার ওজন দিয়ে এর প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না।
আকার ও ওজন
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর তথ্য এবং এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন অনুযায়ী, বোমাটির ওজন প্রায় ২১ হাজার পাউন্ড, অর্থাৎ ৯ হাজার ৫২৫ কেজি বা সাড়ে ৯ টনের কাছাকাছি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট। জিপিএস ও ইনর্শিয়াল নেভিগেশনভিত্তিক নির্দেশনা ব্যবস্থা বোমাটিকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে। তবে এই ব্যবস্থা লক্ষ্যে পৌঁছানোর নির্ভুলতা বাড়ালেও বিস্ফোরণের পর ক্ষয়ক্ষতির পরিসর সীমিত রাখতে পারে না।
আকাশ থেকে কীভাবে নিক্ষেপ করা হয়
সাধারণ যুদ্ধবিমানের মতো ডানা বা বাইরের পাইলনে ঝুলিয়ে এই বোমা বহন করা যায় না। অত্যন্ত ভারী হওয়ায় এটি বিশেষভাবে উপযোগী সামরিক পরিবহন বিমান থেকে মোতায়েনের জন্য তৈরি। বিমান থেকে মুক্ত হওয়ার পর পাখনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উড্ডয়নপথ ঠিক রাখে, আর জিপিএস ও ইনর্শিয়াল নেভিগেশন অবস্থান নির্ণয়ে সহায়তা করে। তবে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে পৌঁছানো এবং বিস্ফোরণে আশপাশে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হবে, এ দুটি আলাদা বিষয়।
কেন ‘মাদার অব অল বম্বস’
এমওএবি নামটি অস্ত্রটির আনুষ্ঠানিক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। আর ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামটি এর বিশাল আকার ও ধ্বংসক্ষমতার কারণে জনপ্রিয় হয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে ব্যবহারের সম্ভাবনা মাথায় রেখে অস্ত্রটি দ্রুত তৈরি ও পরীক্ষা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিশাল বিস্ফোরণক্ষমতা প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি। কারণ, সামরিক ক্ষেত্রে অস্ত্রের প্রভাব কেবল সরাসরি ধ্বংসে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিস্ফোরণের দৃশ্য, শব্দ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রতিপক্ষের মনোবল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৭ সালে আফগানিস্তানে প্রথম ব্যবহার
পরীক্ষা ও উন্নয়নপর্বের পর ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে এমওএবি ব্যবহার করা হয়। আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের আচিন জেলায় ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখার (আইএস-কে) একটি সুড়ঙ্গ ও গুহা কমপ্লেক্সে বোমাটি ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, ওই এলাকায় আইএস-কে যোদ্ধারা সুড়ঙ্গ, বাংকার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। অভিযানের লক্ষ্য ছিল সেই অবস্থান ধ্বংস করা এবং সেখানে অভিযান পরিচালনাকারী মার্কিন ও আফগান বাহিনীর জন্য বাধা কমানো। এত বড় প্রচলিত বোমা এর আগে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়নি, তাই এটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পারমাণবিক বোমার সাথে পার্থক্য
এমওএবিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা বলা হলেও এটি পারমাণবিক বোমার সমতুল্য শক্তি উৎপন্ন করে না। পারমাণবিক বোমা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে। ফলে বিস্ফোরণের পাশাপাশি তাপীয় বিকিরণ, তেজস্ক্রিয়তা এবং পরিস্থিতিভেদে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে। এমওএবির ধ্বংসাত্মক প্রভাব আসে মূলত বিস্ফোরণ ও বায়ুচাপ থেকে, এতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব নেই।
তবে পারমাণবিক নয় বলে এটিকে কম বিপজ্জনক ভাবার সুযোগ নেই। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বা বেসামরিক অবকাঠামোর কাছে ব্যবহার করলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ স্থাপনা কি ধ্বংস করতে পারে
বিশাল বিস্ফোরণক্ষমতা থাকলেও এমওএবি সব ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য তৈরি নয়। বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণ ও বায়ুচাপ ছড়িয়ে দেওয়াই এর প্রধান শক্তি। গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত, পুরু শিলা বা শক্তিশালী কংক্রিটে সুরক্ষিত স্থাপনার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যই সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। স্থাপনা কত গভীরে, ওপরের মাটি বা শিলার পুরুত্ব কত, নির্মাণে কী উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে এবং কীভাবে সুরক্ষিত, এসব বিষয়ই হামলার ফল নির্ধারণ করে।
এ কারণে ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে এমওএবি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রটির আকার বা বিস্ফোরণক্ষমতা একাই এ ধরনের লক্ষ্য ধ্বংসের নিশ্চয়তা দেয় না।
সামরিক শক্তির প্রদর্শন, নাকি কৌশলগত সমাধান
এমওএবির মতো অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সামরিক লক্ষ্য, রাজনৈতিক হিসাব, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার প্রশ্ন। একটি বড় বিস্ফোরণ সামরিক স্থাপনা বা প্রতিরক্ষা অবস্থান ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তাতে কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা নির্মূল হবে, প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ করবে বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অবসান ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমওএবির সম্ভাব্য ব্যবহারের আলোচনা সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে। অস্ত্রটি ব্যবহৃত হলে সংঘাতের তীব্রতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য অর্জনে এর কার্যকারিতা কতটা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সব মিলিয়ে ‘মাদার অব অল বম্বস’ আধুনিক প্রচলিত অস্ত্রের বিশাল ধ্বংসক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে লক্ষ্যবস্তু, পরিস্থিতি ও কৌশলগত উদ্দেশ্যের ওপর। শক্তিশালী অস্ত্র থাকা আর সেই অস্ত্র দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা সামরিক ফল পাওয়া এক কথা নয়।


