মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা, পরনে ময়লা কাপড়, চারপাশে মলমূত্র আর পোকামাকড়ের উপদ্রব। অসুস্থ শরীর নিয়ে খোলা আকাশের নিচে ঘন জঙ্গলে রাত কাটছিল ৭৫ বছর বয়সী জেলেকা বেগমের। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থ মাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে রেখেছেন তার বড় মেয়ে ময়না বেগম। তবে মায়ের ওপর নির্যাতন ও অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না। তার দাবি, মা নিজেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের একটি জঙ্গলে এমন অবস্থায় জেলেকা বেগমকে দেখতে পান স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, অসুস্থতা ও চলাফেরায় অক্ষমতার কারণে নিজের উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই বৃদ্ধার। তার এমন দুরবস্থা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
জেলেকা বেগম স্থানীয়দের কাছে অভিযোগ করেন, গত ১০ অক্টোবর রাতে তার বড় মেয়ে ময়না বেগম তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তাকে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়। মেয়ের বাড়িতে থাকাকালে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া গলা চেপে ধরা ও লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগও করেন এই বৃদ্ধা।
জেলেকা বেগমের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। তার কোনো ছেলে নেই, রয়েছে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে ময়না বেগমের বয়স ৪৮ বছর। তিনি স্বামী ও এক ছেলেমেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে বসবাস করেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে থাকেন। ছোট মেয়ে সীমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে দেশে রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় জেলেকা বেগমের। এরপর থেকে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বড় মেয়ে ময়না বেগমের বাড়িতেই থাকতেন তিনি। তবে প্রতিবেশীদের অভিযোগ, সেখানে তার জীবনযাপনের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।
প্রতিবেশীদের দাবি, ছোট দুই মেয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় বড় মেয়ে ময়না বেগমের বাড়িতে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই বাড়িতে থেকেও বৃদ্ধা মায়ের ঠাঁই হয়েছিল পুরোনো ও জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ঘরটিতে আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানান তারা।
একটি বাড়িতে পাকা ঘর থাকার পরও অসুস্থ বৃদ্ধার জীবন কেন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃদ্ধা যেভাবে জঙ্গলে পড়ে আছেন, তাতে যেকোনো সময় শিয়াল-কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে পারেন। সাপ-বিচ্ছুরও ভয় রয়েছে। রাতের অন্ধকারে মাটির ওপর একা পড়ে থাকেন তিনি। এভাবে একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবেন?’
আরেক প্রতিবেশী তোফাজ্জেল অভিযোগ করেন, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। কখনো শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হতো, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হতো না। যে পাত্রে তাকে খাবার দেওয়া হতো, সেই পাত্রে কুকুর-বিড়ালও খেত বলে দাবি করেন তিনি।
মাকে মারধর ও অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম। তার দাবি, মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না।
ময়না বেগম বলেন, আমি তাকে মারধর করি না। তার থাকার ঘরটিও আমরা সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখতাম। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক-দুই দিন তাকে গোসল করানো হতো।
ময়না বেগমের কিশোর ছেলে মাসুমের ভাষ্য, তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। নিজেদের খাওয়া-দাওয়াই ঠিকমতো চলে না। এর মধ্যেও তারা নানির দেখাশোনা করেন। তার অভিযোগ, নানির অন্য দুই মেয়ে একবারের জন্যও খোঁজ নিতে আসেননি এবং কোনো খরচও দেন না।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে আর্থিক সংকট ও বৃদ্ধার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে প্রতিবেশীরা তুলেছেন অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ। ফলে জেলেকা বেগমের দুরবস্থার পেছনের প্রকৃত ঘটনা জানতে অভিযোগগুলো তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছেন। বৃদ্ধার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে সহায়তা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, জেলেকা বেগমের বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি তার জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে কে তার দেখাশোনা করবেন, সে বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জীবনের শেষ বয়সে এসে একজন অসুস্থ বৃদ্ধাকে যেন জঙ্গলের মাটিতে অসহায়ভাবে পড়ে থাকতে না হয়, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা। তারা চান, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক, দায় প্রমাণিত হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক এবং জেলেকা বেগম ফিরে পান নিরাপদ আশ্রয় ও মানবিক মর্যাদা।


