...|...|...

সারাদেশ

১৫০ বছরের প্রাচীন শিববাড়িতে এক হাজার হাতের প্রতিমায় দুর্গাপূজা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:২৯
Shares
১৫০ বছরের প্রাচীন শিববাড়িতে এক হাজার হাতের প্রতিমায় দুর্গাপূজা

১৫০ বছরের প্রাচীন শিববাড়িতে এক হাজার হাতের প্রতিমায় দুর্গাপূজা। ছবি: টাইমস টুডে

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কাদিপুর শিববাড়ি- যাকে বলা হয় সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন মন্দির। প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী এই শিববাড়িতে এবারও পূজা হচ্ছে ব্যতিক্রমী ২৩ ফুট উঁচু সহস্রভুজা অর্থাৎ এক হাজার হাতের দুর্গা প্রতিমায়। যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থী।

সরেজমিনে রবিবার (১৮ অক্টোবর ) কাদিপুর শিববাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক অপরূপ সাজে সেজেছে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ। প্রবেশমুখ থেকে বাড়ির ভেতর পর্যন্ত একাধিক সুদৃশ্য তোরণ, রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যের কারুকার্য। দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে প্রধান সড়ক থেকে বাড়ির ভেতর পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ ফুট রাস্তা আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে।

বাড়ির ভেতরে পাশাপাশি তিনটি মন্দির। ‘আনন্দ সেবাধাম’ নামের মন্দিরের দোতলায় ২০২২ সালে লাল রং দিয়ে স্থাপন করা হয়েছে এক হাজার হাতের এই বিশাল দুর্গা প্রতিমা। সিমেন্টের তৈরি প্রতিমাটির উচ্চতা ২৩ ফুট। এ বছর নতুন করে বড় দুটি মন্দিরের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে ‘শ্রী শ্রী ভৈরবী মা’ নামে আরেকটি মন্দির, যা মন্দিরের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে শিববাড়ির বাসিন্দা ও সাধক আচার্য সোম মঙ্গল পুলক বলেন, প্রখ্যাত বেতার সম্প্রচারক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মহালয়ার চণ্ডীপাঠের সময় দেবী দুর্গাকে কখনো দশভুজা, কখনো অষ্টাদশভুজা, আবার কখনো সহস্রভুজা উল্লেখ করেছেন। মহিষাসুর বধের সময় দেবী যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, তাতেও তিনি সহস্রভুজা ছিলেন। সেই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা থেকেই আমরা লাল রং দিয়ে সহস্রভুজা দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছি। এই প্রতিমার বিসর্জন হবে না, প্রতিবছর এখানেই নিত্য পূজা হবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পূজা উদযাপন হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য শিববাড়ির বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই বাড়ির স্বর্গীয় অনঙ্গ কুমার সোম ছিলেন জমিদার বংশের। তাদের কুলদেবতা ছিলেন কানাই লাল (রাধাকৃষ্ণ)। পূর্বপুরুষরা সম্পত্তির অনেকটা দেবোত্তর করে দিয়েছিলেন কুলদেবতার নামে।

এই বংশের কোনো এক বংশধর তাদের দীঘির পাড়ে বেলগাছের নিচে নিয়মিত শিবের সাধনা করতেন। সেই সাধনার ফল হিসেবে ১৪০৫ বঙ্গাব্দের (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) শ্রাবণ মাসের ১৮ তারিখে একটি শিবলিঙ্গ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেই শিবলিঙ্গটি ১৫০ বছর পূর্বেকার। সেই থেকে এই বাড়িটি কাদিপুর শিববাড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ভক্তদের কাছে জাগ্রত স্থানে পরিণত হয়।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদার পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলে প্রায় ৩১ বছর তারা শুধু ঘটপূজার মাধ্যমে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করেন। তখন বনেদি পূজার জৌলুস হারিয়ে গেলেও ধর্মীয় বিশ্বাসে একবিন্দু ঘাটতি পড়েনি। ২০০১ সাল থেকে ভক্তদের আর্থিক সহায়তায় মন্দিরটি ফের জৌলুস ফিরে পেতে শুরু করে। বর্তমানে এটি সিলেট বিভাগের অন্যতম বৃহৎ ও সুন্দর মন্দিরে পরিণত হয়েছে।

ইতোমধ্যে শিববাড়ি মন্দির পরিদর্শন করেছেন কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুস্তাফিজুর রহমান ও কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না।

ওসি শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, উপজেলার ২২৬টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে বিট পুলিশিং, সর্বদলীয় নিরাপত্তা কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি সমাবেশ করা হচ্ছে।

ইউএনও সানজিদা আক্তার বলেন, কুলাউড়ার শিববাড়ি সিলেটের মধ্যে সর্ববৃহৎ ও সুন্দর মন্দির। এর প্রস্তুতি খুবই সন্তোষজনক। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে প্রশাসন সম্মিলিতভাবে কাজ করছে।

প্রতিবছর এই শিববাড়িতে লাখো ভক্তের ঢল নামে। প্রাচীন কারুকার্যময় তিনটি মন্দিরের এই সমাহার এখন শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।