জগতে মানবজীবনের একমাত্র পরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো মৃত্যু। প্রতিটি জীবিত সত্তাকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু মানুষের মনে চিরন্তন একটি কৌতূহল কাজ করে, মৃত্যুর ঠিক অন্তিম মুহূর্তে ঠিক কী ঘটে? মানুষ কি নিজের মৃত্যুর আগমন ও যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে? নাকি দেহ নিথর হয়ে পড়ার আগে অনুভূতি স্তব্ধ হয়ে যায়?
আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের পাশাপাশি ইসলাম এ বিষয়ে স্পষ্ট ও গভীর আলোকপাত করেছে। বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ তার এক আলোচনায় মৃত্যুর অনুভূতি এবং এ সংক্রান্ত ধর্মীয় অনুশাসন অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
পবিত্র কোরআন ও বোখারি শরিফের প্রামাণ্য হাদিসের ভিত্তিতে তিনি জানান যে, মৃত্যুর সময় মানুষের দেহে ও আত্মায় যে যন্ত্রণাময় বা অলৌকিক অনুভূতি তৈরি হয়, তা ওই ব্যক্তি নিজে স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করতে পারে, যদিও তার চারপাশে অবস্থানরত নিকটজন তা বুঝতে বা প্রত্যক্ষ করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই অন্তিম মুহূর্ত সম্পর্কে পরম সত্য ঘোষণা করে বলেছেন, ‘আর মৃত্যুর যন্ত্রণা সত্যসহ আগমন করবে; যা থেকে তুমি পালিয়ে বাঁচতে চাইতে।’ (সুরা কাফ: ১৯)
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, মৃত্যু এমন এক বাস্তব ঘটনা যা থেকে পালানোর কোনো পথ নেই এবং মৃত্যুর সময় এই জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি মানুষের সামনে উপস্থিত করা হয়।
১. মৃত্যুর যন্ত্রণা ও হাদিসের সুস্পষ্ট বার্তা
মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের যন্ত্রণার রূপ কেমন হয় এবং তা অনুভব করা যায় কি না এ বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ সহিহ বোখারির হাদিস উল্লেখ করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর কষ্ট সম্পর্কে স্পষ্ট বাণী প্রদান করেছেন যে, মৃত্যুর নির্দিষ্ট যন্ত্রণা বা সাকরাত রয়েছে। তবে এই যন্ত্রণার তীব্রতা সব মানুষের ক্ষেত্রে একরকম হয় না; বরং এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। ইসলামিক বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, মৃত্যুর সময় যদি কোনো মানুষের কষ্ট বা যন্ত্রণা হয়, তবে মৃত ব্যক্তি তা পুরোপুরি অনুভব করতে পারে। বাহ্যিকভাবে আশপাশের মানুষ হয়তো দেখে লোকটা চুপচাপ শুয়ে আছে বা নিথর হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু অন্তরালে ওই ব্যক্তির আত্মিক ও শারীরিক স্তরে মৃত্যুর যন্ত্রণার অনুভূতি স্পষ্টভাবেই চলমান থাকে।
২. ইমানদার ও নাফরমানের রুহ কবজের পার্থক্য
মৃত্যুর অনুভূতি কতটা স্বস্তিদায়ক বা কষ্টদায়ক হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে মানুষের ঈমান ও আমলনামার ওপর। হাদিসের দীর্ঘ বর্ণনার আলোকে শায়খ আহমাদুল্লাহ দুই ধরনের মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরেন:
মুত্তাকি ও ইমানদারের মৃত্যু: একজন খাঁটি ঈমানদার ও জান্নাতী মানুষের দেহ থেকে যখন রুহ (আত্মা) পৃথক করা হয়, তখন আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা তা অত্যন্ত আলতো, মসৃণ ও সুন্দরভাবে বের করে নেন। ফলে সে তেমন কোনো কষ্ট অনুভব করে না।
পাপী ও নাফরমানের মৃত্যু: বিপরীতে, একজন নাফরমান বা পাপী মানুষের কাছে মালাকুল মউত ও মৃত্যুর ফেরেশতারা এসে কঠোর বাণী শোনান এবং অত্যন্ত ভয়ানকভাবে তার দেহ থেকে আত্মা টেনে বের করেন। এই কষ্টকে তুলনা করা যায় কাঁটাতারের মধ্য থেকে ভেজা সুতি কাপড় বা পশুর চামড়া টেনে ছেড়ার যন্ত্রণার সাথে। দুনিয়ার মানুষ হয়তো তার সেই অব্যাখ্যাত অন্তর্দাহ বা আর্তচিৎকার শুনতে পায় না, কিন্তু অন্তিম মুহূর্তে ওই ব্যক্তি সেই ভয়ানক যন্ত্রণা হাড়িকাঠে অনুভব করে।
৩. বাহ্যিক কষ্ট দেখে মানুষ বিচার করার সামাজিক ভুল
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত কুসংস্কার হলো, কারো মৃত্যু যদি ছটফট করে, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে কিংবা দীর্ঘ যন্ত্রণার মাধ্যমে হয়, তবে তাকে অমঙ্গলজনক বা খারাপ মানুষ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। শায়খ আহমাদুল্লাহ এজাতীয় ভুল ধারণার কঠোর সমালোচনা করে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, বাহ্যিকভাবে কারোর মৃত্যুর যন্ত্রণা দেখে লোকটা ভালো নাকি মন্দ-এ বিচার করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
নেককারের কষ্টের মৃত্যু: কোনো ঈমানদার ব্যক্তি জীবনে অনেক ভালো কাজ করলেও দু-একটি ছোট গুনাহ থেকে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা পরম দয়ায় মৃত্যুর সময় সামান্য বাহ্যিক কষ্ট দিয়ে তার সেই গুনাহ চুকিয়ে দেন, যেন আখেরাতে তাকে আর কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে না হয়।
পাপীর সহজ মৃত্যু: অন্যদিকে, একজন অবাধ্য মানুষ হয়তো সারাজীবন খারাপ কাজ করেছে, কিন্তু দু-একটি ভালো কাজও হয়তো ছিল। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই তার মৃত্যুর সময়টা সহজ করে কিংবা কোনো নিয়ামত দিয়ে সেই পাওনা চুকিয়ে দেন, যাতে আখেরাতে তার আর কোনো ভালো কাজের পাওনা বাকি না থাকে।
অতএব, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে বা চিকিৎসালয়ে ছটফট করে মারা যাওয়া দেখে কোনো মানুষকে খারাপ মনে করা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে প্রচণ্ড কষ্টে মারা যাচ্ছেন মনে হলেও, একজন ঈমানদার ব্যক্তি মূলত আল্লাহর তরফ থেকে অদৃশ্য এক নিয়ামত ও জান্নাতী স্বাচ্ছন্দ্যের ভেতরেই দুনিয়া ত্যাগ করেন।
৪. শেষ পরিণতিই আসল
মৃত্যুর অনুভূতির সত্যতা আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তের গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কাজের মূল মূল্যায়ন নির্ভর করে তার শেষ পরিণতির ওপর (ইন্নামাল আমালু বিল খাওয়াতিম)। সারাজীবন ভালো কাজ করেও শেষ মুহূর্তে ইমানহারা হওয়ার যেমন ঝুঁকি থাকে, তেমনি সারাজীবন পথভ্রষ্ট থেকেও শেষ মুহূর্তে খাঁটি তাওবা করে জান্নাতি হওয়ার পথ সুগম হতে পারে।
তাই অন্যের মৃত্যুর বাহ্যিক রূপ দেখে মন্তব্য না করে, নিজেদের মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শায়খ আহমাদুল্লাহর আলোচনা থেকে আমাদের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহর কাছে সার্বক্ষণিক ‘হুসনে খাতিমাহ’ বা সুন্দর মৃত্যুর প্রার্থনা করা, যেন আল্লাহ আমাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় জান্নাতি মেহমান হিসেবে আমাদের ইমানের সাথে বিদায় দেন।


