...|...|...

ধর্ম

ইসলামের মানদণ্ডে যারা ‘ভালো বন্ধু’

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:৫০
Shares
ইসলামের মানদণ্ডে যারা ‘ভালো বন্ধু’

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে বন্ধুত্ব শুধু পারস্পরিক পছন্দ বা স্বার্থের সম্পর্ক নয়; বরং একজন মানুষের ঈমান, চরিত্র ও জীবনাচরণে বন্ধুর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। সৎ বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে, ভুল থেকে সতর্ক করে এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। বিপরীতে অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে অন্যায় ও গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণেই পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সঙ্গী ও বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে বলা হয়েছে। ইসলাম এমন বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেয়, যে বন্ধুত্ব দুনিয়ায় কল্যাণ বয়ে আনে এবং আখিরাতেও মুক্তির পথে সহায়ক হয়। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রকৃত ও সৎ বন্ধু নির্বাচনের রূপরেখা এখানে তুলে ধরা হলো

১. সৎ ও পরহেজগার বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব

মানুষ স্বভাবগতভাবেই তার সঙ্গীর আচার-আচরণ ও রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রিয়নবী (স.) সতর্ক করে বলেছেন

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

‘মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতি অনুসরণ করে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩)

পবিত্র কুরআনেও প্রকৃত ইমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে তারা একে অপরের সুহৃদ ও বন্ধু। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন।

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

‘আর ইমানদার পুরুষ এবং ইমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। তাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৭১)

২. সৎসঙ্গ বনাম অসৎসঙ্গের প্রভাব

ভালো বন্ধু ও মন্দ সঙ্গীর পার্থক্য বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (স.) অত্যন্ত সুন্দর একটি উপমা পেশ করেছেন

مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ، لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا أْنَ تَشْتَرِيَهُ أَوْ تَجِدَ رِيحَهُ، وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً

‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হলো কস্তূরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের মতো। মৃগ কস্তূরী বহনকারী হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে বা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নয়তো তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’ (বুখারি ৫১৩৬)

৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা ও ইমানের পূর্ণতা

স্বার্থহীনভাবে কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসা ইমানের অন্যতম একটি পূর্ণতা। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে

مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসল, আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করল, আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর জন্য কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকল, সে ব্যক্তি নিজ ইমানকে পূর্ণতা দান করল।’ (আবু দাউদ ৪৬৮৩)

ইসলামি স্কলারদের মতে, যারা মহান আল্লাহর খাতিরে পরস্পরকে ভালোবাসে, আল্লাহর ভালোবাসাই তাদের প্রাপ্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অন্য গ্রামে ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতে যাওয়া ব্যক্তির পথ চলায় স্বয়ং ফেরেশতা সুসংবাদ দিয়ে বলেন

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে এরূপ ভালোবাসেন, যেরূপ তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাস।’ (মুসলিম ২৫৬৭)

৪. ভুল বন্ধু নির্বাচনের পরিণাম ও কুরআনের সতর্কবাণী

শয়তান বা মন্দ মানুষের প্ররোচনায় পড়ে যারা দুনিয়াতে ভুল মানুষকে বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়, হাশরের মাঠে তাদের চরম আফসোসের মুখোমুখি হতে হবে। পবিত্র কুরআনে সেই চিত্র এভাবে আঁকা হয়েছে

يَا وَيْلَتَى لَيْتني لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا

‘হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্ৰহণ না করতাম!’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ২৮)

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ভালো বন্ধুর কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা গুণের কথা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে

  • বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হওয়া।
  • সৎ স্বভাবের অধিকারী হওয়া।
  • পাপাচারী ও বেদআতি (দ্বীনের মধ্যে নতুন ধারা প্রবর্তক) না হওয়া।
  • দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হওয়া।

বন্ধুত্ব কেবল দুনিয়াবী মেলামেশা বা আনন্দ-ফুর্তির নাম নয়; বরং এটি পরকালের নাজাত বা ধ্বংসের অন্যতম মাধ্যম। তাই প্রিয়নবী (স.)-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে মুমিন ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সৎসঙ্গ (বন্ধু) বেছে নেওয়ার এবং জীবনকে সফল করার তৌফিক দান করুন আমিন।