...|...|...

লাইফস্টাইল

মন খারাপের চেয়েও গভীর অনুভূতিহীনতা, কী এই অ্যানহেডোনিয়া?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১১:৪৭
Shares
মন খারাপের চেয়েও গভীর অনুভূতিহীনতা, কী এই অ্যানহেডোনিয়া?

ছবি: সংগৃহীত

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মেজাজ ও আবেগেও কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে শরৎ পেরিয়ে শীতের আগমনে দিনের দৈর্ঘ্য কমে যায়, তাপমাত্রা নেমে আসে। এ সময় অনেকেরই ঘরের বাইরে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। কারও কারও মধ্যে দেখা দেয় অলসতা, বিষণ্নতা কিংবা একধরনের উদাসীনতা।

তবে সাময়িক মন খারাপ আর দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতিহীনতা এক বিষয় নয়। আগে যেসব কাজ করতে ভালো লাগত, সেগুলোতেই যদি আর আনন্দ না পাওয়া যায়, এমনকি প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটিয়েও মনে তৃপ্তি না আসে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। মনোবিজ্ঞানে আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানহেডোনিয়া’।

জীবনধারাবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এর এক প্রতিবেদনে মনোবিদেরা জানিয়েছেন, সাধারণ মন খারাপের সঙ্গে অ্যানহেডোনিয়ার পার্থক্য রয়েছে। তবে সঠিক পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এ অবস্থা মোকাবিলা করা সম্ভব।

অ্যানহেডোনিয়া কী, সাধারণ মন খারাপের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থা ‘লায়নফ্লাওয়ার স্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা ও নিবন্ধিত মনোবিদ এরিন বারবোসার মতে, অ্যানহেডোনিয়া এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে আগে আনন্দদায়ক মনে হওয়া কাজগুলো থেকেও মানুষ আগের মতো আনন্দ বা তৃপ্তি অনুভব করতে পারেন না।

সাধারণ মন খারাপের ক্ষেত্রে কারও মন বিষণ্ন থাকলেও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পছন্দের সিনেমা দেখা কিংবা প্রিয় কোনো কাজে সাময়িক আনন্দ খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু অ্যানহেডোনিয়ার ক্ষেত্রে সেই আনন্দ অনুভবের ক্ষমতাই কমে যায়।

এ অবস্থায় শখের কাজ, বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটালেও ভেতরে আনন্দ বা তৃপ্তি অনুভূত হয় না। অনেক সময় বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও ব্যক্তির মধ্যে একধরনের শূন্যতা ও আবেগগত অবশভাব কাজ করে।

কেন তৈরি হয় এই অনুভূতি?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যানহাটন মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলিং’-এর মনোচিকিৎসক নাটালি বুচওয়াল্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অ্যানহেডোনিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সার্কিট্রি’ বা পুরস্কার-সংক্রান্ত স্নায়বিক ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যবস্থা কোনো কাজের সম্ভাব্য আনন্দ উপলব্ধি করা এবং সেই আনন্দ উপভোগের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।

অ্যানহেডোনিয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, কিছু শারীরিক অসুস্থতা কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। জীবনযাপনের অনিয়ম, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ফলে একসময় প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডা, ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা কিংবা অবসরের পছন্দের কাজগুলোও আনন্দের পরিবর্তে দায়িত্ব বা বোঝা মনে হতে শুরু করে।

অ্যানহেডোনিয়া মোকাবিলায় পাঁচটি করণীয়

১. জোর করে খুশি হওয়ার চেষ্টা করবেন না

মন খারাপ বা আনন্দহীনতার মধ্যে নিজেকে জোর করে ভালো রাখার চেষ্টা অনেক সময় উল্টো মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন, তবে প্রতিটি কাজ থেকেই তাৎক্ষণিক আনন্দ পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না।

২. ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরুন

মনোবিজ্ঞানে ‘বিহেভিওরাল অ্যাক্টিভেশন’ নামে একটি পদ্ধতি রয়েছে। এতে আগ্রহ বা প্রেরণা ফিরে আসার অপেক্ষা না করে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

যেমন- পছন্দের গান শোনা, অল্প সময় হাঁটা, নিজের পছন্দের খাবার তৈরি করা কিংবা বই পড়া। শুরুতে এসব কাজে আনন্দ না পেলেও নিয়মিত চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অভ্যাস তৈরি হতে পারে।

৩. আনন্দের পাশাপাশি মানুষের সাথে সংযোগ বাড়ান

আনন্দ অনুভব করতে না পারলে সামাজিক মেলামেশাও অনেক সময় কঠিন মনে হয়। তবু এমন মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন, যার কাছে নিজের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করা যায়।

প্রতিদিন নিজেকে শুধু ‘কী করলে ভালো লাগবে’- এ প্রশ্ন না করে ভাবতে পারেন, ‘কী করলে নিজের জীবন ও আশপাশের মানুষের সঙ্গে আরও সংযুক্ত বোধ করব?’

৪. সৃজনশীল কাজ ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকুন

কোনো প্রতিযোগিতা বা উৎপাদনশীলতার লক্ষ্য ছাড়াই নিজের পছন্দের সৃজনশীল কাজে সময় দিন। বাগান করা, ডায়েরি লেখা, ছবি আঁকা কিংবা গান শোনার মতো ছোট কাজ দিয়ে শুরু করতে পারেন।

পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে হাঁটা, সবুজের মধ্যে থাকা কিংবা দিনের আলোতে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও প্রকৃতির সান্নিধ্য মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে।

৫. প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন

আনন্দহীনতা বা শূন্যতার অনুভূতি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বিশেষ করে দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চললে এবং কাজ, পড়াশোনা, ঘুম কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাব ফেললে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

এ ধরনের সমস্যার সঙ্গে বিষণ্নতার অন্যান্য উপসর্গও থাকতে পারে। তাই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, জীবনযাপনে পরিবর্তন কিংবা ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, অ্যানহেডোনিয়া কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। তাই নিজের অনুভূতিকে অবহেলা না করে সময়মতো সহায়তা নেওয়াই সুস্থতার পথে প্রথম পদক্ষেপ।