...|...|...

বিশ্ব

রয়টার্সের প্রতিবেদন

বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহে ঝুঁকিতে অন্তঃসত্ত্বা নারী, বাড়ছে অপরিণত শিশু জন্মের হার

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:৩২
Shares
বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহে ঝুঁকিতে অন্তঃসত্ত্বা নারী, বাড়ছে অপরিণত শিশু জন্মের হার

ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে দাবদাহ বা তাপপ্রবাহের তীব্রতা, সময়সীমা ও ব্যাপকতা। যার মারাত্মক ও প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছেন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাদের গর্ভস্থ সন্তান। দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত তাপমাত্রার ফলে একদিকে মায়ের শারীরিক জটিলতা যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে গর্ভের শিশুর প্রাক-পরিপক্ক বা অপরিণত জন্ম (প্রিমেচিউর বার্থ), কম ওজন এবং নানাবিধ স্বাস্থ্যসংকটের বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

মেক্সিকোর ৮০ লাখের বেশি শিশুর জন্মসংক্রান্ত ডাটাবেস বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, গর্ভধারণের শেষ মাসে কোনো নারী তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হলে নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান প্রসূত হওয়ার হার সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

রয়টার্সের এই বিশেষ অনুসন্ধানে মূল ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পেয়েছে:

১. বিশ্বব্যাপী মাত্রা ছাড়াচ্ছে ‘হিট স্টর্ম’ বা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ

গত সাড়ে ছয় দশকে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের ধরন ও পরিধিতে ভয়াবহ রূপান্তর ঘটেছে। অতীতে যেসব তাপপ্রবাহ সাময়িক বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখা দিত, তা এখন মাস কিংবা বছরজুড়ে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এ ধরনের সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘায়িত তাপপ্রবাহকে গবেষকেরা ‘হিট স্টর্ম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সাথে যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টানা পাঁচ দিন ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ১০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করলে তাকে তাপপ্রবাহ গণ্য করা হয়। আর এই চরম আবহাওয়া বৈশ্বিক স্থলভাগের অন্তত ১ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তার লাভ করলে তাকে বলা হয় ‘হিট স্টর্ম’। ১৯৬০ সাল থেকে প্রতি ঘণ্টার বৈশ্বিক তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশকে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল মাত্র ৫০টি; অথচ চলতি দশকেই তা লাফিয়ে ৬৬৫টি ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি সবচেয়ে দীর্ঘ একটি তাপপ্রবাহ টানা এক বছর স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ডকে প্রভাবিত করেছিল।

২. গর্ভবতী মা ও অনাগত সন্তানের জন্য বাড়তি বিপদ

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিষয়ক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চরম গরমের সাথে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, জন্মগত শারীরিক ত্রুটি, গর্ভপাত এবং মৃত সন্তান প্রসবের আশঙ্কাজনক সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষকরা জানান, শুধু অতিরিক্ত চরম তাপমাত্রা নয়, বরং একজন নারী স্বাভাবিক যে তাপমাত্রায় অভ্যস্ত—তার চেয়ে মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বৃদ্ধিও গর্ভাবস্থার নানা শারীরিক জটিলাতার কারণ হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে অপরিণত সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে, যা মেক্সিকোর লাখ লাখ ডেটা পর্যালোচনায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে।

৩. ঝুঁকির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই

বিশ্বের মরু অঞ্চল, নাতিশীতোষ্ণ এলাকা কিংবা আর্দ্র বনাঞ্চল—যে কোনো ভৌগোলিক জলবায়ুতেই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য তাপপ্রবাহ সমান বিপজ্জনক।

মেক্সিকোর শুষ্ক মরুভূমি থেকে শুরু করে আর্দ্র জঙ্গল কিংবা শীতল পাহাড়ি অঞ্চল—সব পরিবেশেই চরম তাপের সঙ্গে অপরিণত শিশু জন্মের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। একইসাথে চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও গর্ভাবস্থায় উচ্চ তাপমাত্রার স্বাস্থ্যগত কুপ্রভাবের অভিন্ন প্রমাণ মিলেছে।

৪. ক্ষতির পথ ও প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ঠিক কী প্রক্রিয়ায় গর্ভাবস্থায় বিপত্তি দেখা দেয়, তা নিয়ে এখনও গভীর গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, অতি গরমে মায়ের শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা থেকে রক্ত শরীরের অন্য অংশে ধাবিত করে। ফলে গর্ভের শিশু প্রয়োজনীয় রক্ত ও প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সংকট বা ঘাটতিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি ভ্রূণের হৃৎপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে মা ও শিশুদের রক্ষা করতে বিশ্বব্যাপী নানা কৌশল নেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে শুরু করে আমেরিকার মায়ামি পর্যন্ত ছাদ সাদা রঙ করা, বড় কিনারাযুক্ত টুপি ব্যবহার কিংবা এয়ার কন্ডিশনার নিশ্চয়ের মাধ্যমে গর্ভবতী নারীদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

৫. গবেষণার মাঝে নিজের জীবন দিয়েই অভিজ্ঞতা অর্জন

গর্ভাবস্থায় তীব্র তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালাতে গিয়ে খোদ গবেষক-চিকিৎসক দর্শনিকা লাখু নিজেই এর শিকার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি রিভিউ পেপারের অন্যতম সহলেখক ছিলেন তিনি।

গবেষণাপত্রটি লেখার সময়েই তিনি নিজেই প্রখর তাপপ্রবাহের মধ্যে গর্ভে যমজ সন্তান বহন করছিলেন। এমনিতেই যমজ সন্তান ধারণে শারীরিক ঝুঁকির আশঙ্কা বেশি থাকে, তার ওপর চরম তাপ যুক্ত হয়ে তার দেহে তিনটি মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে নির্ধারিত সময়ের পুরো ছয় সপ্তাহ আগেই চিকিৎসকরা তার সন্তান প্রসব করান।

লাখু রয়টার্সকে সতর্ক করে বলেন, ধীরে ধীরে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে থাকা এই পৃথিবীতে আসলে কেউই নিরাপদ নয়, বিশেষ করে আমাদের গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুরা।

সর্বোপরি, জলবায়ুর এই বিরূপ আচরণ এখন আর কেবল কোনো পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি মানবজাতির আগামী প্রজন্মের জন্য ও মাতৃস্বাস্থ্যে এক প্রকাণ্ড চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।