যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয় না। তবে নির্ধারিত হয় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। আর সেই ফলের ওপরই নির্ভর করতে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরেন ট্রাম্প। তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে। তবে মেয়াদের মাঝপথেই তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পরপর এই ভোট অনুষ্ঠিত হয় বলেই এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন।
কীভাবে হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন?
এই নির্বাচনে মূলত ভোট হয় কংগ্রেসের দুই কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, আইনসভা এবং স্থানীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন হয়।
প্রতিনিধি পরিষদে আসন রয়েছে ৪৩৫টি। অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয়। সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ায় প্রতি দুই বছর পরপর সব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, সিনেটে রয়েছে ১০০টি আসন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব আসনে একসাথে ভোট হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর সাধারণত সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনের পাশাপাশি সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন। অর্থাৎ, কংগ্রেসের মোট ৪৭০টি আসনের জন্য ভোট দেবেন মার্কিন ভোটাররা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে কী হয়?
এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল হারলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে যেতে পারে। তবে এর অর্থ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এমন নজির রয়েছে।
১৯৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদের ৫৪টি এবং সিনেটের আটটি আসন হারায়। প্রায় ৪০ বছর পর প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ যায় রিপাবলিকানদের হাতে। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়ে বিরোধিতা, কর ও ব্যয়নীতি নিয়ে অসন্তোষ এবং ক্লিনটনের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াকে এই ফলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়।
এরপর ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের ৬৩টি আসন হারায়। সিনেটেও ছয়টি আসন কমে যায় তাদের। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর বেকারত্ব, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব পড়ে ভোটে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেয় রিপাবলিকানরা।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও একই ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা আসে। রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের ৪১টি আসন হারালেও সিনেটে দুটি আসন বাড়ায়। ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত শুরু করে। ২০১৯ সালে তাকে অভিশংসনও করে প্রতিনিধি পরিষদ। তবে সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় তাকে পদ থেকে সরানো যায়নি।
সর্বশেষ ২০২২ সালে জো বাইডেনের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের মাত্র নয়টি আসন হারায়। উল্টো সিনেটে একটি আসন বাড়ে তাদের। মূল্যস্ফীতি ও বাইডেনের কম জনপ্রিয়তার মধ্যেও প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফল করে দলটি।
ট্রাম্পের সামনে রয়েছে যেসব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের সামনে বেশ কিছু রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, আমদানি পণ্যে শুল্ক, ইরান যুদ্ধ এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে তার প্রশাসন সমালোচনার মুখে। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা।
এপি-নরকের জরিপেও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় তার ভূমিকার প্রতি ৮৩ শতাংশ এবং অর্থনীতি পরিচালনায় ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা অনাস্থা জানিয়েছেন। আর ৬৫ শতাংশের মতে, শুল্কের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
এই অসন্তোষের প্রভাব ভোটে পড়লে প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে রিপাবলিকানরা। কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে গেলেই ট্রাম্পের জন্য আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তেও বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি বাড়তে পারে। এমনকি প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারে তারা। তবে অভিশংসনের পর পদ থেকে সরাতে হলে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় না। ট্রাম্পের মেয়াদও ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে।
শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে ট্রাম্পের?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, এই ভোট শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করে না; প্রেসিডেন্টের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক পথও অনেকটা ঠিক করে দেয়। ১৯৯৪ সালে ক্লিনটন, ২০১০ সালে ওবামা এবং ২০১৮ সালে ট্রাম্প- তিন প্রেসিডেন্টকেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এবারও ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তার প্রেসিডেন্ট পদ তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিতে পড়বে না। তবে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে কংগ্রেসের তদন্ত বাড়তে পারে। নতুন করে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধসহ সামরিক পদক্ষেপ ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও কংগ্রেসে জবাবদিহির মুখে পড়তে পারেন তিনি।
অর্থাৎ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলেও ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হবে না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

