দোকানে সাজানো সিঙ্গারা, সমুচা, বালিশাই আর লাড্ডু। ক্রেতারা আসছেন, নিজের পছন্দের খাবার তুলে নিচ্ছেন, সামনে থাকা রেট চার্ট দেখে হিসাব করছেন। এরপর নির্ধারিত টাকা রাখছেন খোলা ক্যাশবাক্সে। খুচরা প্রয়োজন হলে সেটিও নিতে হচ্ছে নিজেকেই। তবে অবাক করার বিষয়, পুরো প্রক্রিয়ায় নেই কোনো বিক্রেতা। খুলনা বড় বাজারের হেরাজ মার্কেটে প্রায় ১৬ বছর ধরে এভাবেই চলছে ‘আল্লাহর দান সিঙ্গারাঘর সেলফ সার্ভিস’।
ব্যস্ত মার্কেটের মাঝেও ব্যতিক্রমী এই দোকানে ক্রেতাদের জন্য রয়েছে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। সিঙ্গারা-সমুচার সাথে মিলছে কাঁচা মরিচ, বিট লবণ ও টক। পাশাপাশি রাখা আছে বোতলজাত সুপেয় পানিও। বিশ্বাস আর আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলছেন ক্রেতারা। তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও এভাবে সেলফ সার্ভিসে সিঙ্গারা-সমুচা বিক্রির দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না।
খুলনা নগরীর খালিশপুরের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান আকন বলেন, “আমি আমার বাবার মুখ থেকেই এই দোকানের কথা শুনেছি। সেই থেকে যখনই এদিকে আসি, এই দোকানে এসে খাবার খাই। অবিশ্বাসের এই সময়ে একজন বিক্রেতা ছাড়াই এভাবে দোকান চলতে দেখা সত্যিই অবাক করার মতো। মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থার এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”
খুলনা জেলা স্কুলের স্কাউট শাহরিয়ার বলেন, “আমি প্রায় দুই বছর ধরে নিয়মিত এখান থেকে খাবার খাচ্ছি। এখানকার খাবারের স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি বিক্রেতা ছাড়াই যে পদ্ধতিতে দোকানটি চলছে, সেটিও আমার কাছে বেশ ভালো লাগে।”
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী সাইদুর রহমান বলেন, “এটা খুবই ভালো একটা সার্ভিস। সেলফ সার্ভিস হওয়ায় নিজের পছন্দমতো খাবার নিয়ে খেতে পারি। অনেক সময় পরিবারের জন্যও এখান থেকে খাবার বাসায় নিয়ে যাই।”
স্কুলছাত্র শৌভিক দে বলেন, “এখানকার সিঙ্গারা, সমুচা, বালিশাই ও লাড্ডু আমার খুব ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে, নিজের পছন্দমতো খাবার নিজেই নিয়ে খেতে পারি। বিক্রেতা না থাকলেও সবাই নিজের মতো করে খাবার নিয়ে টাকা দিয়ে যায়। বিষয়টি আমার কাছে বেশ ভালো লাগে।”
মূলত এটি সততা স্টোর হিসেবেই পরিচালিত হয়, যেখানে ক্রেতাদের সততার ওপরই পুরো ব্যবস্থাটি নির্ভর করে।
সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সারাদিনই চলে বেচাকেনা। দোকানের মালিক সোহেল ও সহযোগী কারিগর লিটন ব্যস্ত থাকেন সিঙ্গারা-সমুচা তৈরিতে। গরম তেলে একের পর এক ভাজা হয় মুখরোচক এসব খাবার। আর দোকানে আসা ক্রেতারা নিজেরাই পছন্দের খাবার তুলে নিয়ে, হিসাব করে টাকা রেখে চলে যান।
বিভিন্ন জায়গায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও এই দোকানে কাজ শুরু করার পর নিজের কাজ ও সংসার নিয়ে সন্তুষ্ট লিটন।
কারিগর লিটন বলেন, “আমি আগে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি। তবে এখানে কাজ শুরু করার পর বেশ ভালো আছি। নিজের কাজ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট, পাশাপাশি সংসারও ভালোভাবে চালাতে পারছি। সবচেয়ে ভালো লাগে, আমরা খাবার তৈরি করি আর ক্রেতারা নিজেদের মতো করে খাবার নিয়ে টাকা রেখে যান। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে দোকান চলতে দেখে আমারও ভালো লাগে।”
বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দোকানে প্রতিদিনই আসছেন নানা বয়সী ক্রেতা। কেউ বাজার করতে এসে, কেউবা দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন শুধু এখানকার খাবারের স্বাদ নিতে। এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যবসার অভিজ্ঞতা। ক্রেতাদের প্রতি আস্থাকেই এই উদ্যোগের মূল শক্তি বলছেন দোকানের উদ্যোক্তা সোহেল।
প্রায় ২৮ বছর ধরে একই স্থানে চলছে ‘আল্লাহর দান সিঙ্গারাঘর’। তবে সেলফ সার্ভিস পদ্ধতিতে বিক্রি শুরু করেন ২০১০ সালে। এরপর থেকে ক্রেতাদের আস্থায় এখনো একইভাবে চলছে দোকানটি।
দোকানের উদ্যোক্তা সোহেল বলেন, “প্রায় ২৮ বছর ধরে একই জায়গায় ব্যবসা করছি। ২০১০ সালে সেলফ সার্ভিস পদ্ধতিতে বিক্রি শুরু করি। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা চিন্তা থাকলেও ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থা তৈরি হয়েছে। এখন ক্রেতারাই নিজের পছন্দের খাবার নিয়ে হিসাব করে টাকা রেখে যান। মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর ক্রেতাদের সততাই আমাদের এই উদ্যোগকে এত বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে।”
বিক্রেতা নেই, তবুও থেমে নেই বেচাকেনা। মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থার ওপর ভর করে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ব্যস্ত বাজারে তাই ‘আল্লাহর দান সিঙ্গারাঘর সেলফ সার্ভিস’ শুধু খাবারের দোকান নয়, হয়ে উঠেছে পারস্পরিক বিশ্বাসেরও এক অনন্য উদাহরণ।


