দেশে এলপিজি আমদানি অব্যাহত থাকলেও খুলনার বাজারে দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট। একদিকে বাসাবাড়ির রান্নার সিলিন্ডার মিলছে না, অন্যদিকে অটো গ্যাস স্টেশনগুলোতে এলপিজি ও সিএনজির জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। খুলনা নগরীর মুজগুন্নীর ডিএম অটো ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস সাপ্লাই স্টেশনের সামনে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) থেকে যানবাহনের সারি প্রায় এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক চালককে বিকল্প জ্বালানিতে যেতে হয়েছে।
খুলনার বাজারসংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত এলপিজির সরবরাহ কমে গেছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী স্বাভাবিক সরবরাহের অর্ধেকেরও কম গ্যাস পাচ্ছেন। কয়েকজন এজেন্টের দাবি, চাহিদার তুলনায় কোথাও ১০ শতাংশেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
নগরীর মুজগুন্নী এলাকার গ্যাস বিক্রেতা ওলি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে যমুনা, ওমেরা, পেট্রোলিয়াম, ফ্রেশ, সেনা, নাভানা ও দুবাই বাংলা কোম্পানির গ্যাস নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। তার দাবি, অনেক কোম্পানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি করতে পারছেন না। সরবরাহ সংকটের সুযোগে কোনো কোনো ব্যবসায়ী গ্যাস মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওলি জানান, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও সংকটের মধ্যে কোথাও ১ হাজার ৭০০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
আসাদ স্টোরের কর্মকর্তা হাসিবুজ্জামান বলেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে তাদের দোকানে নিয়মিত গ্যাস নেই। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সকালে পাশের একটি দোকান থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে ১০টি সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন। পরে ওই বিক্রেতা দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ের তথ্য বলছে, দেশে এলপিজি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ নেই। আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়। সেপ্টেম্বরের ২২ দিনেই আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। একই সময়ে ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠকে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা দেশে এলপিজির কোনো সামগ্রিক সংকট নেই বলে দাবি করেন।
তাহলে খুলনায় সংকট কেন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে আসছে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন জটিলতা। আন্তর্জাতিক নৌপথের অস্থিরতা, জাহাজ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, এলসি জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় লিকুইড সরবরাহে সমস্যা হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গল্লামারীর মেট্রোপলিটন ফিলিং স্টেশনের মালিক অ্যাডভোকেট মাসুদ হোসেন রনি বলেন, সাধারণত চার থেকে পাঁচ হাজার লিটার গ্যাসের জন্য পে-অর্ডার করা হলেও এখন চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে, ঝড়ের কারণে জাহাজ চলাচলে সাময়িক বিঘ্নসহ বিভিন্ন কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে সিএনজি খাতেও রয়েছে সরবরাহ সংকটের অভিযোগ। গ্যাসের ঘাটতির কারণে সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠন গত ২৮ সেপ্টেম্বর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্টেশন বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করলেও পরে সরকারের আশ্বাসে তা স্থগিত করে।
বুধবার সকাল থেকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেন সিএনজি চালক ইদ্রিস। তিনি বলেন, দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও বিকেল পর্যন্ত গ্যাস পাননি। গাড়ি সরিয়ে নিতে ভ্যানচালককে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। তার ভাষায়, আজকের দিনের ইনকাম শেষ।
এলপিজি ব্যবহারকারী গাড়ির মালিক আরিফ আহমেদ জানান, সোমবার একটি স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে ডুমুরিয়া থেকে ফেরার পথে গাড়ির এলপিজি শেষ হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে অকটেনে গাড়ি চালাতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে সংকটের পেছনে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার চাপের পাশাপাশি মজুতের অভিযোগও উঠেছে। ফলে দেশে এলপিজি আমদানি অব্যাহত থাকার পরও খুলনার মতো আঞ্চলিক বাজারে সরবরাহ কেন কমছে, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচেও।


