শিশুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে চুমু দেওয়া স্বাভাবিক। তবে এই আদরের মাধ্যমেই ছড়াতে পারে বিভিন্ন সংক্রমণ। বিশেষ করে নবজাতকের ক্ষেত্রে চুমুর মাধ্যমে হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস ছড়ালে তা গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। শুধু নবজাতক নয়, বড় শিশুদেরও চুমুর মাধ্যমে কিছু সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই শিশুকে চুমু দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, নবজাতকের হারপিস সংক্রমণ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শুধু অপরিচিত ব্যক্তি নয়, পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেও শিশুর শরীরে জীবাণু ছড়াতে পারে।
চুমুতে ছড়াতে পারে ‘কিস অব ডেথ’ ভাইরাস
‘কিস অব ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর চুমু’ নামে পরিচিত বিষয়টি মূলত নবজাতকের হারপিস সংক্রমণের গুরুতর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস মুখের আশপাশে ঘা সৃষ্টি করতে পারে এবং সংক্রমিত ব্যক্তির মুখের সংস্পর্শে ছড়াতে পারে। ঠোঁটে জ্বরঠোসা বা ঘা থাকলে শিশুকে চুমু দেওয়া উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উপসর্গ না থাকলেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
নবজাতকের শরীরে এ ভাইরাস প্রবেশ করলে ত্বক, চোখ ও মুখের পাশাপাশি মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হয়। তবে চুমু খেলেই শিশুর সংক্রমণ হবে, এমন নয়; ঝুঁকি নির্ভর করে ভাইরাসের সংস্পর্শ, শিশুর বয়স ও অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।
বড় শিশুদেরও রয়েছে সংক্রমণের ঝুঁকি
শুধু নবজাতক নয়, বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও চুমুর মাধ্যমে কিছু সংক্রমণ ছড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র—সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, এপস্টেইন-বার ভাইরাসের কারণে হওয়া ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস বা ‘কিসিং ডিজিজ’ মূলত লালার মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগে জ্বর, গলাব্যথা, লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া হারপিস ভাইরাসের সংস্পর্শে ঠোঁটে ফোসকা বা ঘা হতে পারে। ফ্লু ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা, কাশি-হাঁচির কণা কিংবা সংক্রমিত নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। কিছু ত্বকের সংক্রমণও সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়। তবে সব চর্মরোগ চুমুর মাধ্যমে ছড়ায় না।
শিশুর দাঁতের ক্ষয়রোগের সঙ্গেও মুখের ব্যাকটেরিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু চুমুর কারণেই দাঁতের ক্ষয় হয়—এমন নয়। খাদ্যাভ্যাস, মুখের পরিচ্ছন্নতা ও দাঁতের যত্নসহ বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখে। একইভাবে, চুমু খেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়—এমন দাবির পক্ষে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
শিশুকে সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
নবজাতককে কোলে নেওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া জরুরি। বিশেষ করে জন্মের প্রথম ছয় সপ্তাহে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্যদের শিশুকে চুমু দেওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো। কারও ঠোঁটে জ্বরঠোসা বা হারপিসের ঘা থাকলে শিশুকে চুমু দেওয়া উচিত নয়। শিশুর মুখ, নাক ও চোখের কাছে চুমু না দেওয়াই নিরাপদ। বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও অসুস্থ অবস্থায় চুমু দেওয়া এবং লালার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
শিশুর শরীরে ফোসকা, জ্বর, দুধ খেতে অনীহা, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা কিংবা খিঁচুনির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে নবজাতকের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ অবহেলা করা বিপজ্জনক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শিশুর প্রতি স্নেহ প্রকাশের পাশাপাশি তার স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চুমু খাওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়—এমন প্রমাণ না থাকলেও সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা জরুরি।



