মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদন। পরিবহন খরচ, নিত্যপণ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের আয়ের ওপর এর সরাসরি চাপ পড়ছে।
এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির এপ্রিলের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ ও জরুরি সহায়তা প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৬ জুন খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা ও জ্বালানি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলারের দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় বিশ্বব্যাংক।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম বিনিয়োগ ও রাজস্ব ঘাটতির চাপের মধ্যেই নতুন এই সংকটে পড়ল দেশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৪ লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসবেন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই সংখ্যা নেমে ৫ লাখে ঠেকতে পারে; অর্থাৎ দারিদ্র্যমুক্তির সুযোগ হারাতে পারেন আরও ১২ লাখ মানুষ।
পাশাপাশি জ্বালানির বাড়তি দামের জেরে মূল্যস্ফীতি ০.৫ শতাংশের বেশি বাড়লে তার দ্বিতীয় দফার অভিঘাত নিম্নআয়ের মানুষের ওপর তীব্র হবে। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৩২ শতাংশে নেমেছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত না থাকলে এটি আরও কমত।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে। দেশের মোট আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে সংঘাতের জেরে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিতেই সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।
যুদ্ধের আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১০ থেকে ১২ ডলার থাকলেও জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ থেকে ২৮ ডলারে। সরকারের ওপরও ভর্তুকির চাপ তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় দাঁড়াতে পারে ২৫০ থেকে ৪৮০ কোটি ডলারে, যা জিডিপির প্রায় ২.৮ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের ধাক্কা লেগেছে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও। দেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি (৩৯২ কেজি) সার ব্যবহৃত হয়। অথচ গ্যাস সংকটের কারণে মার্চে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া কারখানার পাঁচটির উৎপাদনই সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছিল। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
অন্যদিকে, দেশের ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে। বড় ৬৪টি সরকারি হাসপাতালের মাসিক বিদ্যুৎ বিলই বর্তমানে প্রায় ৬ থেকে ১১ লাখ ডলার। এছাড়া ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল এবং হাসপাতালের ৯০ শতাংশ চিকিৎসাসামগ্রী আমদানিনির্ভর হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে এই আর্থিক সংকট তীব্র হচ্ছে যখন দেশে হামের প্রকোপে ৯৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত ও আরও ৮৬১টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কার লক্ষণগুলো এরই মধ্যে অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নতুন গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, কারখানায় কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া কিংবা কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বাস্তব পরিস্থিতিই বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে ফুটে উঠেছে।



