...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

ফার্মেসিতে ভুল স্ক্রিনিংয়ের বাণিজ্য: অনিয়মে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬, সকাল ৯:২৯ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৬:২২
Shares
ফার্মেসিতে ভুল স্ক্রিনিংয়ের বাণিজ্য: অনিয়মে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি: এআই

দেশে অসংক্রামক রোগ আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। বেশিরভাগ মানুষই না বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আর এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে এসব ওষুধের দোকান। আগে একটি ওষুধ কিনতে কয়েক কিলোমিটার ছুটতে হলেও এখন ঘর থেকে বের হলেই দেখা মেলে ফার্মেসির। কোনোপ্রকার নিয়মনীতি ও আইনের তোয়াক্কা না করে এসব ফার্মেসি এখন পরিণত হয়েছে একেকটি অননুমোদিত ‘মিনি ক্লিনিক’ ও ‘প্রেসক্রিপশন সেন্টার’-এ। চিকিৎসকের কোনো বৈধ সনদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়াই সস্তা, ত্রুটিপূর্ণ ও ক্যালিব্রেশনহীন ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর ভর করে প্রতিদিন লাখো মানুষকে দেওয়া হচ্ছে জীবনঘাতী ভুল পরামর্শ। এসব ফার্মেসিওয়ালাদের এই ‘ডাক্তারি’ ও ‘বাণিজ্যিক লোভের’ কারণে হাজারো মানুষ অকালেই পঙ্গুত্ব,অন্ধত্ব কিংবা স্থায়ী অঙ্গহানির মরণফাঁদে পা দিচ্ছেন। 

টাইমস টুডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন এক নীরব স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র। বিশেষজ্ঞরা  বলছেন, একটি ফার্মেসি চালাতে অন্ততপক্ষে সি-গ্রেড ফার্মাসিস্টের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও গলির ভেতরের অধিকাংশ দোকানেই শুধু পূর্ব-অভিজ্ঞতা বা নামমাত্র কোনো ট্রেনিংয়ের ওপর ভর করে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কড়া অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের ওষুধ কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো স্পর্শকাতর ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। এর ফলে রোগীরা যেমন ভুল ওষুধ বা ভুল ডোজের ঝুঁকিতে পড়ছেন, ঠিক তেমনি ঢালাওভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির কারণে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাড়ছে ঝুঁকি 

৫৮ বছর বয়সী মুদি ব্যাবসায়ী আনোয়ার হোসেন। মাস খানেক আগে হালকা মাথাব্যথা আর শরীর ম্যাচম্যাচ করায় হাতিরপুলের বাসার নিচের ফার্মেসিতে গিয়েছিলেন তিনি। দোকানে থাকা সেলসম্যান এক সস্তা ডিজিটাল মেশিনে তার রক্তচাপ মেপে জানিয়েছিলেন, প্রেশার অনেক হাই (১৬০/১০০); এখনই ওষুধ শুরু না করলে স্ট্রোক হতে পারে। এই প্রতিবেদককে জানান, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ওই ফার্মেসি থেকেই শুরু হলো উচ্চ রক্তচাপের নিয়মিত ওষুধ। কিন্তু টানা ২০ দিন সেই ওষুধ খাওয়ার পর হঠাৎ একদিন বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান তিনি। 

এরপর সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, তার রক্তচাপ আসলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম (৯০/৬০) ছিল। মূলত তীব্র ডিহাইড্রেশনের কারণে সেদিন তার মাথা ঘুরছিল প্রেশারের জন্য নয়। চিকিৎসকরা জানান, রক্তচাপ কম থাকা অবস্থায় হাই-প্রেশারের ওষুধ খাওয়ায় তার কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে গেছে এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ভুল ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় এখন মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন।

ভুল মেশিনের ফাঁদে অন্ধত্বের ঝুঁকি

শুধু ভুল ওষুধ শুরু করাই নয় ফার্মেসিগুলোর মানহীন মেশিনের ভুল রিডিংয়ের কারণে রোগ পুষে রেখে অন্ধত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন অনেকে।  লালবাগের সমাজকল্যাণগলির বাসিন্দা গৃহিণী রাবেয়া খাতুনের (৪৫)। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও পায়ের পাতায় জ্বালাপোড়ায় ভুগছিলেন রাবেয়া। ডায়াবেটিস হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে তিনি স্থানীয় এক ফার্মেসিতে নিয়মিত গ্লোকোমিটারে রক্ত পরীক্ষা করাতেন। ফার্মেসির সেই পুরোনো ও মানহীন গ্লোকোমিটারে প্রতিবারই খাওয়ার পর রিডিং আসত ৭.৫ বা ৮.০ যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রায় স্বাভাবিক।

আলাপকালে এই প্রতিবেদককে রাবেয়া জানান, ফার্মেসিওয়ালা তাকে আশ্বস্ত করেন  তার কোনো ডায়াবেটিস নেই। নিশ্চিন্তে রাবেয়া আর কোনো ডাক্তার দেখাননি। কিন্তু গত সপ্তাহে হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করলে তিনি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান। সেখান থেকে ল্যাবরেটরিতে রক্তের সঠিক ‘এইচবিএ১সি’ পরীক্ষা করানোর পর দেখা যায় তার ডায়াবেটিসের গড় মাত্রা গত তিন মাস ধরে ১২-এর ওপরে ছিল। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে তার চোখের রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যাকে চিকিৎসকরা বলছেন ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ফার্মেসির ভুল বা মেয়াদোত্তীর্ণ স্ট্রিপের কারণে তিনি সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাননি এবং আজ অন্ধত্বের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

মফস্বলে ‘ফার্মেসি-ডাক্তারি’ ও স্টেরয়েডের মরণকামড়

শুধু আনোয়ার আর রাবেয়া খাতুনই নয় এমন অসংখ্য ভুক্তভোগীর সন্ধান মিলেছে। সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের  বাজারগুলোতে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকে পুঁজি করে ফার্মেসি মালিক বা সামান্য বেতনের কর্মচারীরাই মূলত চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করছেন। ডাক্তারি ফিস বাঁচাতে রোগীরাও আর যাচ্ছেন না ডাক্তারদের কাছে। দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকার ফার্মেসিগুলোতে ক্যালিব্রেশন বা ত্রুটিমুক্তকরণ ছাড়া সস্তা ও পুরোনো রক্তচাপ মাপার যন্ত্র এবং গ্লোকোমিটারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ বা ডেট-এক্সপায়ারড স্ট্রিপ দিয়ে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার কারণে রোগীরা মারাত্মক ভুল ফলাফল পাচ্ছেন। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, সামান্য জ্বর,সর্দি বা কাশির জন্য কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সাধারণ মানুষকে উচ্চমাত্রার থার্ড বা ফোর্থ জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে 'অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স'যা ভবিষ্যতে সাধারণ অসুখেও মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একই সাথে দ্রুত বাতের ব্যথা উপশম কিংবা মোটা হওয়ার ওষুধ হিসেবে গ্রামের অসচেতন মানুষকে দেওয়া হচ্ছে উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর স্টেরয়েড। ফলে অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ এবং অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন স্থায়ী লিভার ও কিডনি বিকলতায়।

দোকানের সিংহভাগই লাইসেন্সবিহীন

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে বৈধ বা লাইসেন্সধারী ফার্মেসির সংখ্যা দেড় লাখ । কিন্তু মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সূত্রে এই প্রতিবেদক নিশ্চিত হয়েছেন যে, অনুমোদনহীন বা লাইসেন্স ছাড়া অলিতে-গলিতে থাকা ওষুধের দোকানের প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ওষুধের দোকান থাকার পরও প্রতি মাসে গড়ে ২৩৭টি নতুন বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ‘জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬’ এবং ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩’ অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওটিসি তালিকাভুক্ত ৩৯টি সাধারণ ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো লাইফ-সেভিং বা ক্রনিক রোগের ওষুধ বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বাস্তব চিত্র হলো,দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি ফার্মেসিতে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই প্রেশার ডায়াবেটিস বা হার্টের ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে এবং সেলসম্যানরা নিজেরাই ডাক্তার সেজে রোগীদের আজীবনের ওষুধ ধরিয়ে দিচ্ছেন। 

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)- এর সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের ১৮ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি ৫ জনের ১ জন অর্থাৎ প্রায় ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অন্যদিকে, দেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখের বেশি, যা আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) মতে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ডায়াবেটিস আক্রান্ত দেশের তালিকায় এনে দাঁড় করিয়েছে। চিকিৎসকদের শঙ্কা, এই বিশাল রোগীবাহিনীর একটা বড় অংশই ল্যাবরেটরিতে সঠিক পরীক্ষার বদলে পাড়ার ফার্মেসির সস্তা ও ক্যালিব্রেশনহীন মেশিনের রিডিংয়ের ওপর নির্ভরশীল যা প্রতিনিয়ত বড় ধরণের অঙ্গহানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) এবং সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) শাখার সর্বশেষ যৌথ জরিপ ও তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশেরই মূল কারণ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ,যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ,স্ট্রোক,ডায়াবেটিস,ক্যানসার ও কিডনি রোগ। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে,এসব রোগে যারা মারা যাচ্ছেন,তাদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশেরই বয়স ৩০ থেকে ৭০ বছর। অর্থাৎ দেশের একটি বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অকালেই এই রোগের কারণে ঝরে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক স্ক্রিনিং ও চিকিৎসার অভাব এবং পাড়ার ফার্মেসিগুলোর অননুমোদিত মিনি-ক্লিনিক কালচার।

ডিভাইসের দুর্বল ব্যাটারি ও টার্গেট পূরণের বাণিজ্য

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফার্মেসিগুলোতে ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইসগুলো নিয়মিত ক্যালিব্রেট করতে হয় এবং ব্যাটারির চার্জ কম থাকলে এগুলো প্রায়ই ভুল রিডিং দেয়। কিন্তু দেশের অলিতে-গলিতে থাকা অধিকাংশ ফার্মেসিতেই ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার নন-ব্র্যান্ডেড ডিজিটাল মেশিন দিয়ে চলছে এই স্ক্রিনিং বাণিজ্য। সরেজমিনে অনুসন্ধানের সময় রাজধানীর আজিমপুরে ঢাকা মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী এই প্রতিবেদকের কাছে অকপটে স্বীকার করেন, ‘আমাদের এখানে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ প্রেশার আর ডায়াবেটিস মাপতে আসে। পারদ মেশিন দিয়ে মাপা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় আমরা ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করি। বলেন, মাঝেমধ্যে ব্যাটারি দুর্বল হলে বা কাস্টমার নড়াচড়া করলে রিডিংয়ে একটু কম-বেশি আসতেই পারে। আমরা তো আর ডাক্তার না কিন্তু কাস্টমাররাই জোর করে বলে ডাক্তার দেখানোর ভিজিট নাই, তাই একটা প্রেশারের ওষুধ দিতে। চেনা কাস্টমার হিসেবে তখন ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয় এবং এতে আমাদেরও দুই পয়সা লাভ থাকে।’
 
আইন ভাঙার কথা স্বীকার করে গ্রিনরোড এলাকার এক ফার্মেসির মালিক সাখাওয়াত হোসেন এই প্রতিবেদককে শোনালেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি প্রেসক্রিপশন ছাড়া প্রেশার-ডায়াবেটিসের ওষুধ দেওয়া অন্যায় জেনেও ব্যবসায়িক টিকে থাকার স্বার্থে তারা এটি করেন। পাশের দোকানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ দিলে তিনি না দিলে কাস্টমার অন্য দোকানে চলে যাবে। তাছাড়া বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা এসে আমাদের টার্গেট দেয় এবং প্রেশারের ওষুধ বেশি বিক্রি করতে পারলে কমিশন বা আকর্ষণীয় গিফট দেয়। তখন অনেক সময় প্রেশার একটু বর্ডারলাইনে দেখলেই রোগীকে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।’

আইন বনাম ‘মডেল ফার্মেসি’র বাস্তবতা

দেশের প্রচলিত ড্রাগ অ্যাক্ট বা ঔষধ নীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ফার্মেসিগুলো শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই রোগ নির্ণয়,স্ক্রিনিং বা নতুন কোনো ক্রনিক রোগের ওষুধ তারা নিজেরা সাজেস্ট করতে পারে না। ডায়াবেটিস বা প্রেশারের মতো সংবেদনশীল রোগ, যার ওষুধ একবার শুরু করলে সাধারণত সারাজীবন খেতে হয়, তা বিক্রি হচ্ছে স্রেফ ফার্মেসিওয়ালার মৌখিক আশ্বাসে ও বাণিজ্যিক লোভে। অথচ দেশের জাতীয় ওষুধ নীতি অনুযায়ী ফার্মেসি ব্যবসা চলার কথা সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়মে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) নিয়ম অনুযায়ী, দেশে ওষুধের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘মডেল ফার্মেসি’ এবং ‘মডেল মেডিসিন শপ’ নীতিমালার বিধান রয়েছে। একটি আদেশ বা মডেল ফার্মেসি হতে হলে সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে একজন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ‘এ’ গ্রেডের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। এছাড়াও, পুরো দোকান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে এবং ইনসুলিনের মতো সংবেদনশীল ওষুধ নির্দিষ্ট ফ্রিজে রাখতে হবে। 

সবচেয়ে বড় কথা, সরকার নির্ধারিত ৩৯টি সাধারণ ওটিসি ওষুধ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, হাই-প্রেশার বা ডায়াবেটিসের মতো জীবনরক্ষাকারী কোনো ওষুধ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা এই মডেল ফার্মেসিগুলোতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মতো বড় বড় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বেসরকারি পর্যায়ে লাজ ফার্মা, তামান্না ফার্মেসি বা পপুলার ও ইবনে সিনার মতো কিছু চেইন ফার্মেসি এই মডেল নীতি মেনে পরিচালিত হচ্ছে। 

মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সংকট দূর করতে অন্তত একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডিপ্লোমা বা ‘সি’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট দিয়ে ‘মডেল মেডিসিন শপ’ চালুর নিয়মও রয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদকের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা লাখো ফার্মেসির মধ্যে এই নিয়ম মানা দোকানের সংখ্যা হাতেগোনা। সিংহভাগ ফার্মেসিতেই নেই কোনো ফার্মাসিস্ট বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, ফলে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের গুণগত মান।

এদিকে, গত ১৭ মাসে ৪ হাজার ২৯টি নতুন লাইসেন্স দেওয়া হলেও এর মধ্যে সরকারি সব শর্ত মেনে ‘মডেল ফার্মেসি’ হয়েছে মাত্র ৭৯টি, যা মোট অনুমোদনের মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, একটি মডেল ফার্মেসির জন্য ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট এবং মডেল মেডিসিন শপের জন্য ১২০ বর্গফুট পাকা স্পেস, এসি এবং ইনসুলিন বা ভ্যাকসিন রাখার জন্য সচল ফ্রিজ থাকা বাধ্যতামূলক।

মালিকদের শঙ্কা প্রকাশ 

দেশে হুট করে সব ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্ট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে অবাস্তবসম্মত বলে দাবি করছে বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি (বিসিডিএস) ও সাধারণ ফার্মেসি মালিকরা। তারা বলছেন, সারা দেশে দুই লাখেরও বেশি ফার্মেসি থাকলেও সেই তুলনায় সনদধারী ফার্মাসিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। এই বিপুল ঘাটতি পূরণ না করে প্রশাসন জোরপূর্বক আইন কার্যকর করতে গেলে দেশের সিংহভাগ ওষুধের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে, যা গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে দেবে।

পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় সংকটের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। মফস্বল বা গ্রামের একটি ছোট ওষুধের দোকানের সীমিত আয় দিয়ে একজন উচ্চশিক্ষিত ফার্মাসিস্টকে মোটা অঙ্কের বেতন দেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর ফলে ছোট দোকানগুলো বন্ধের মুখে পড়বে এবং এই খাতের লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বেন বলে মনে করছেন তারা।

নীরব মহামারী ও মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান

ভুল স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অসংক্রামক রোগের ওষুধ খাওয়ার ভয়াবহতা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন টাইমস টুডেকে বলেন,  উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস শুধু একবার মেশিন দিয়ে মেপেই নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর জন্য রোগীর শারীরিক ইতিহাস, ল্যাব টেস্ট এবং একাধিক দিনের রিডিং দেখতে হয়। ফার্মেসির ভুল রিডিং দেখে কেউ যদি ভুল ওষুধ খাওয়া শুরু করে, তবে রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে ব্রেন স্ট্রোক বা কিডনি ফেইলিউর হতে পারে। আবার রোগ থাকার পরও যদি ভুল মেশিনের কারণে তা ধরা না পড়ে তবে নীরবেই রোগীর হার্ট, কিডনি বা চোখ চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। 

চিকিৎসার ব্যয়ে পকেট খালি ও উত্তরণের পথ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন  বলছে, বাংলাদেশে একজন রোগীর চিকিৎসার মোট খরচের প্রায় ৬৮.৫ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এই নিজস্ব খরচের ওপর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ টাকাই চলে যায় শুধু ওষুধ কিনতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাড়ার ফার্মেসিগুলোর ভুল ও বিভ্রান্তিকর স্ক্রিনিংয়ের কারণে মানুষ যখন ভয় পেয়ে অপ্রয়োজনীয় বা ভুল ওষুধ খাওয়া শুরু করে তখন তাদের এই চিকিৎসার ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে চিরতরে নিঃস্ব ও ঋণগ্রস্ত করে ফেলে। এই অনিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক লালসার পেছনে প্রধানত চিকিৎসার চড়া ব্যয়, সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ লাইন এবং বেসরকারি চেম্বারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি এড়ানোর মানসিকতা কাজ করছে। সাধারণ মানুষ হাতের কাছে সহজে ও বিনাপয়সায় পরামর্শ পাওয়ায় ফার্মেসিকেই প্রথম ভরসা হিসেবে বেছে নেন।

এদিকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ওষুধ প্রশাসনের পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এই গ্রামীণ ও প্রান্তিক ফার্মেসিগুলোতে নিয়মিত তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো সম্ভব হয় না যা এই অবৈধ বাণিজ্যকে আরও প্রভাবিত করছে।

ওষুধ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমস টুডেকে বলেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রেশার-ডায়াবেটিসের মতো লাইফ-সেভিং ওষুধ বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও দোকান সিলগালা করছে। তবে মাঠপর্যায়ে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন টাইমস টুডেকে বলেন, এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে এখনই ‘মডেল ফার্মেসি’ বা ‘মডেল মেডিসিন শপ’ নীতিমালা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাদেশে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি আইন করে সম্পূর্ণ বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সাথে প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বা নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানো দরকার যাতে মানুষকে হাতুড়ে ফার্মেসির ওপর নির্ভর করতে না হয়। 

তার মতে, ওষুধের এই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ও ভুল স্ক্রিনিংয়ের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে অসংক্রামক রোগের এই আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা অচিরেই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন টাইমস টুডেকে বলেন, অলিগলিতে গড়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন ও অনিবন্ধিত ওষুধের দোকানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। ইতোমধ্যে আমরা নিবন্ধনবিহীন দোকানের একটি তালিকা তৈরি করছি, যা দ্রুতই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হবে, যেখানে দোকান মালিকদের ৩ মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হবে। দেশের সব জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন এই ৩ মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন বা নিবন্ধন করা না হলে তারা কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

পরিচালক আরো বলেন, ​অসংক্রামক রোগ শুধু ফার্মেসির অনিয়মের জন্যই বাড়ে না।  পাশাপাশি অনেকগুলো কারণও থাকে। তবে ওষুধের দোকানের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো একটি মহল্লায় মাত্র একটিই ওষুধের দোকান আছে এবং সেটির কোনো লাইসেন্স নেই। কিন্তু জনস্বার্থে বা আইনি কারণে আমরা যখন সেটি বন্ধ করতে যাই, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা এসে বাধা দেন বা আপত্তি জানান। কারণ তারা সেখান থেকে জরুরি সময়ে সহজে ওষুধ পেয়ে থাকেন। তাই আমরা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনভোগান্তির বিষয়টিও মাথায় রাখছি এবং একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করছি।