দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী ৯ নভেম্বর বসছে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় সভা।
সভায় আলোচ্যসূচিতে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে পারে। প্রথমত, পোশাকশিল্পের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে তাদের প্রস্তাবিত মজুরি হারের লিখিত প্রস্তাব জমা দেবেন। দ্বিতীয়ত, পোশাকশিল্পে নিয়োজিত সব গ্রেডের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি হার নিয়ে আলোচনা হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় সভার এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯ ধারা অনুযায়ী তৈরি পোশাকশিল্পে নিয়োজিত সব শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীর নিম্নতম মজুরি হারের সুপারিশ তৈরির অংশ হিসেবে সভাটি আহ্বান করা হয়েছে।
বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ স্বাক্ষরিত নোটিশ অনুযায়ী, আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) সকাল ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানীর সভাপতিত্বে এতে সদস্যরা অংশ নেবেন।
সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের লিখিত মজুরি প্রস্তাব জমা দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলো পর্যালোচনা এবং নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে।
এদিকে মজুরি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা এড়িয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। তাদের মতে, চলমান আন্দোলন-বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে শ্রমিক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আলোচনার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এসব কথা বলেন।
তারা জানান, নবগঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড ইতোমধ্যে প্রথম সভা করেছে এবং মজুরি পুনর্বিবেচনার কাজ শেষ করার জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে কারখানার মালিকেরা কাজ করবেন বলেও আশ্বাস দেন তারা।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাত্র চার দিন পর দ্বিতীয় সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এত দ্রুত সময়ে সভা আয়োজন শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি নিষ্পত্তিতে সরকারের আন্তরিকতা ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রতিফলন।
হাতেম আরও বলেন, শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে তা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর হবে না। এ ধরনের পরিস্থিতি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, পোশাকশিল্পের কার্যক্রম এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শ্রমিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের পথে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশিল্পের নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল চলমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। এতে শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি নিয়ে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে যে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। এ ক্ষেত্রে শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে কার্যকরের প্রস্তাব দিয়েছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি পেলে বাড়ির মালিকেরা যেন সেই সুযোগে ইচ্ছেমতো বাড়িভাড়া বাড়াতে না পারেন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ ছাড়া পোশাকশ্রমিকদের জন্য রেশনিং সুবিধা অথবা ফ্যামিলি কার্ড চালু, শিল্পাঞ্চলে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন এবং প্রধান শিল্পকেন্দ্রগুলোতে শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসন বা ডরমিটরি নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
মালিকপক্ষের নেতারা বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং মজুরি-সংক্রান্ত সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকার, মালিকপক্ষ ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠনগুলো একসাথে কাজ করছে। এ অবস্থায় মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শেষ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া এবং কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার ওপর তারা গুরুত্ব দেন।


