পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) উপাচার্য অপসারণের দাবিতে চলমান আন্দোলন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপিপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে অপর একটি পক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্যের পক্ষে থাকা স্থানীয় বিএনপিপন্থী একটি গ্রুপ এই হামলায় জড়িত।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুকিত মিয়া বাদী হয়ে দুমকি থানায় ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্থানীয় যুবদল নেতা রিপন শরীফকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এ ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ছয় মাস ধরে চলা ভিসি ও প্রো-ভিসির দ্বন্দ্বই এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ৫৭তম রিজেন্ট বোর্ড সভা ও একই মাসে হওয়া পদোন্নতির বাছাই বোর্ডকে কেন্দ্র করেই দ্বন্দ্বের সূচনা। প্রো-ভিসিপন্থী শিক্ষকদের অভিযোগ, রিজেন্ট বোর্ডে গৃহীত হয়নি এমন সিদ্ধান্তকে বোর্ডের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখিয়ে অফিস আদেশ জারি করেন ভিসি। আলোচ্যসূচির ৭ নম্বর অনুযায়ী ২৪ জনের মধ্যে ২১ জনের পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন স্থগিত রেখে মাত্র তিনজনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
তাদের দাবি, বাছাই বোর্ডের সুপারিশের পর নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়, যা ছিল বিধিবহির্ভূত। ওই কমিটি পুনরায় আবেদন ও ব্যক্তিগত ফাইল পর্যালোচনা করে মাত্র তিনজনকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। একই সাথে শর্ত পূরণ না হওয়ায় মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের পদোন্নতি এবং অধ্যাপক জামাল হোসেনের স্ত্রী জিনাত নাসরিন সুলতানার সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগও অনুমোদন পায়নি। এসব সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমাজে বিভক্তি তৈরি হয়।
বিজয় দিবস উদযাপন নিয়েও দুই পক্ষের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভিসি ও প্রো-ভিসিপন্থীরা আলাদাভাবে দিবসটি পালন করেন। পরে তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইকতিয়ার হোসেনকে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে প্রো-ভিসিপন্থী অধ্যাপক জামাল হোসেন হেনস্তা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানালে ১ জানুয়ারি নতুন রেজিস্ট্রার হিসেবে অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমানকে নিয়োগ দেন ভিসি।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় এ বছরের ৫ জানুয়ারি। ওইদিন কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের সাথে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহানের বাগ্বিতণ্ডা হয়। ড. দেলোয়ারের অপসারণ দাবিতে ভিসির বাসভবন ঘেরাও করেন প্রো-ভিসিপন্থীরা। পরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর মধ্যস্থতায় ড. দেলোয়ারকে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হলেও সেদিনই রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরে তাকে ডিন পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলে ভিসি ও প্রো-ভিসির দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একে অপরকে ‘জামায়াতপন্থী’ আখ্যা দিতে শুরু করেন তারা। গত ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পটুয়াখালীবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন করে উভয়ের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
গত ১১ মার্চ রেজিস্ট্রারের দেওয়া এক লিখিত ব্যাখ্যায় অভিযোগ করা হয়, মহামান্য রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানোর জন্য একটি চিঠিতে ভিসির অনুমোদন ছাড়াই স্বাক্ষর নিতে তাকে চাপ প্রয়োগ করেন ড. এবিএম সাইফুল ইসলামসহ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন রেজিস্ট্রার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিমাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের কম্বাইন্ড ডিগ্রি নিয়েও দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। প্রো-ভিসিপন্থীদের অভিযোগ, ভিসি ড. কাজী রফিকুল ইসলামের সীমাহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। তারা অভিযোগ করেন, অকারণে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শোকজ করা হচ্ছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে ভিসির দাবি, আর্থিক অনিয়ম, জুলাই কর্নার, ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চাওয়ার পরই এসব আন্দোলন শুরু হয়েছে। তার অভিযোগ, পাঁচ মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার প্রস্তুত প্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন প্রক্টর অধ্যাপক আবুল বাশার খান। একই সাথে জুলাই কর্নারের উদ্বোধনী ফলক নষ্ট করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রক্টর অধ্যাপক আবুল বাশার খান। তিনি বলেন, “ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার তৈরির দায়িত্ব নয় সদস্যের কমিটির। শুধু আমাকে দায়ী করা ভিত্তিহীন। জুলাই কর্নারের ফলক নষ্ট করার সাথেও আমি জড়িত নই।”
হামলার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “ঘটনার আগের দিন ভিসি ছয়জন ব্যক্তিকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। হামলাকারীরাও বলেছে, তারা ভিসিকে ‘উদ্ধার’ করতেই এসেছে।”
এদিকে হামলার প্রতিবাদে ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একাংশ।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অতীতে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ লুটপাট, টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া বিল উত্তোলন ও আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় তারা আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এসএম হেমায়েত জাহান বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

