মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারি বাস, ট্রাক ও পিকআপ। কোনো গাড়ির দরজা খুলে চলছে মাছ তোলার কাজ, আবার কোথাও বরফভর্তি বাক্স নিয়ে ব্যস্ত শ্রমিকরা। এর পাশ দিয়েই চলছে কুয়াকাটাগামী পর্যটকবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও স্থানীয় যানবাহন। মাছবোঝাই গাড়ির কারণে সড়কের একটি বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় ধীরগতিতে চলছে যানবাহন। কখনো তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও পর্যটকরা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর মৎস্য বন্দরে প্রতিদিনের এমন চিত্র দেখা যায়। মৎস্য বন্দরটি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হলেও মাছ পরিবহনের জন্য নেই নির্দিষ্ট টার্মিনাল বা আলাদা লোডিং জোন। ফলে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের ওপর কিংবা দুই পাশে গাড়ি রেখে মাছ লোড-আনলোড করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে ব্যস্ত এই মহাসড়কে নিয়মিতই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।
মহিপুর মৎস্য বন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক যানবাহনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। এসব গাড়ি মাছ বোঝাইয়ের সময় সড়কের পাশে বা মূল সড়কের ওপর অবস্থান করায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। দুইদিক থেকে আসা যানবাহন তখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না।
পর্যটন মৌসুম ও ছুটির দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কুয়াকাটা থেকে মহিপুর হয়ে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকারী পর্যটকবাহী বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে ধীরগতিতে চলতে হয়। কখনো দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সম্প্রতি এমন যানজটে আটকা পড়েন ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক আলমগীর ইসলাম। তিনি বলেন, কুয়াকাটা ঘুরে ফেরার পথে মহিপুর এলাকায় এসে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে।
আলমগীর ইসলাম বলেন, মহাসড়কের ওপর এভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মাছ বোঝাই করা হলে যানজট হবেই। আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি, ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট এখানে আটকে ছিলাম, কিন্তু প্রশাসনের কোনো নজরদারি বা যানজট নিরসনে তাদের কোনো ভূমিকা দেখিনি। অথচ শুনলাম, পাশেই মহিপুর থানা। এটা কোনোভাবেই আশা করিনি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার।
খুলনা থেকে কুয়াকাটা ঘুরতে এসে নারী পর্যটক লিমা বেগম বলেন, কুয়াকাটা ঘুরতে এসে আমি আমার ছোট বাবু নিয়ে বাসে মহিপুর এলাকায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। মাছবোঝাই গাড়িগুলো মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক থাকছে না। পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে এখানে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট লোডিং জোন করা দরকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়ক ব্যবহার করে মাছ লোড-আনলোডের কাজ চললেও কার্যকর সমাধান হয়নি। তাদের মতে, মৎস্য ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো না থাকায় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের যেমন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে মহাসড়কের স্বাভাবিক যান চলাচলে।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, মহাসড়ক দখল করে মাছ লোড করা তাদের ইচ্ছাকৃত নয়। মাছ পরিবহনের জন্য মহিপুরে আলাদা কোনো টার্মিনাল বা নির্দিষ্ট লোডিং স্পট না থাকায় বাধ্য হয়েই সড়কের পাশে গাড়ি রাখতে হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, মাছ পরিবহনের জন্য বিকল্প কোনো নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করে দেওয়া হলে তারা সেখানে থেকেই লোড-আনলোডের কাজ করবেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, মহিপুর থানার কাছাকাছি এলাকায় প্রতিদিন মাছবোঝাইয়ের কাজ চললেও যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের তেমন তৎপরতা দেখা যায় না। এতে মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কুয়াকাটায় আসা-যাওয়া করা পর্যটক ও সাধারণ মানুষও দুর্ভোগে পড়ছেন।
মেহেদী হাসান আরও বলেন, মহিপুর মৎস্য বন্দরের মাছ পরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে দ্রুত নির্দিষ্ট লোডিং জোন বা টার্মিনাল করা প্রয়োজন। একইসাথে মহাসড়কের ওপর মাছ লোড-আনলোড বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
মহিপুর মৎস্য বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, আমরাও চাই না মহাসড়কে গাড়ি রেখে মাছ লোড করতে। কিন্তু মাছ পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ব্যবসার প্রয়োজনে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতে হয়। কর্তৃপক্ষ যদি আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হবে।
মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামিম আহমেদ বলেন, বিষয়টি পুলিশেরও নজরে এসেছে। সড়ক ফাঁকা রেখে মাছ লোড-আনলোডের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে এবং যানজট নিরসনে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখব।
এদিকে মহিপুরে যানজটের স্থায়ী সমাধানে অস্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান।
তিনি বলেন, আমরা অস্থায়ীভাবে একটি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছি। এ বিষয়ে মহিপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানকে কাজ শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। কিন্তু চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি কাজটি শুরু করতে পারছেন না। খুব দ্রুতই এই ইউনিয়নে প্রশাসক বসবে এবং নির্মাণাধীন কাজ শুরু হবে।
ইউএনও আরও বলেন, পর্যটক ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে মৎস্য ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের ইতোমধ্যে বিষয়টি জানানো হয়েছে। রাস্তা বন্ধ করে কিংবা সড়কের দুই পাশে গাড়ি পার্কিং করে মাছের গাড়ি লোড-আনলোড করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


