...|...|...

মতামত

নিরাপদ কৃষির ছদ্মবেশে নব্য উপনিবেশবাদ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৩৬ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৩৭
Shares
নিরাপদ কৃষির ছদ্মবেশে নব্য উপনিবেশবাদ

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ভাষা বদলেছে, বাজার বদলেছে; কিন্তু কৃষিকে নিয়ন্ত্রণের উপনিবেশিক কৌশল কি সত্যিই বদলেছে ?

একসময় বলা হয়েছিল, পৃথিবীর ক্ষুধা দূর করতে কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে কৃষিতে ছড়িয়ে পড়ল রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হার্বিসাইড, হাইব্রিড বীজ এবং পরে জেনেটিক প্রযুক্তি।

উৎপাদন বাড়ল ঠিকই, কিন্তু কৃষক একই সঙ্গে মাটি, পানি, বীজ ও নিজের কৃষিজ্ঞান থেকে ক্রমেই দূরে সরে গেলেন। কৃষি হয়ে উঠল বাজারনির্ভর; কৃষকের স্বাধীনতা কমল, বাড়ল বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা। এই নির্ভরতা শুধু বীজ বা সারেই থেমে থাকেনি; কীটনাশক, হার্বিসাইড ও অন্যান্য বালাইনাশকের বাজারও ক্রমে বড় হয়েছে।

দেখা গেছে, বাংলাদেশে কীটনাশকের বার্ষিক ব্যবহার ১৯৭২ সালের প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২২ সালে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। এই কীটনাশকের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকার, ৫ বছরে তা ব্যবহার বেড়েছে ৮১%। অর্থাৎ কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কৃষির প্রয়োজনীয় বহিরাগত উপকরণের বাজারও বিস্তৃত হয়েছে।

ফলে কৃষক শুধু ফসলের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হননি; ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের বাজারের ওপরও তার নির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে আজ আমরা সেই কৃষির ক্ষতি বুঝতে পেরে আবার ফিরছি নিরাপদ কৃষি, অর্গানিক খাদ্য, প্রাকৃতিক কৃষি পণ্য, কেমিক্যাল-ফ্রি-এসব ধারণার দিকে। এটি প্রয়োজনীয় এবং ইতিবাচক পরিবর্তন।

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাকৃতিক কৃষি নতুন কোন বিষয় নয়, এটি কোন অঞ্চলে কৃষির হাজার বছরের কৃষকের লোকায়ত জ্ঞানের নিজস্ব পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠে। কিন্তু এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে, নিরাপদ খাদ্য আসলে কার জন্য? প্রাকৃতিক কৃষিতে উৎপাদিত খাদ্য ক্রয়ে কাদের সামর্থ্য আছে? নিরাপদ কৃষি যদি সবার খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করে, তাহলে তার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য যখন একটি বিশেষ বাজারে পরিণত হয়, তখন প্রশ্নটি অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। আর এখানেই কৃষির নব্য উপনিবেশিকতার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে।

গ্রামের কৃষক নিরাপদ ফসল ফলাচ্ছেন, কিন্তু সেই ফসল গ্রামের মানুষের প্লেটে যাচ্ছে না। যাচ্ছে শহরের ধনী ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের টেবিলে। দাম বেশি, বাজার সীমিত, বিক্রয়কেন্দ্র, সুপারশপ আর বিশেষায়িত দোকানে।

শহরের প্রান্তিক মানুষ কিংবা সাধারণ মানুষ এসব নিরাপদ খাবার কিনতে পারে না। ফলে নিরাপদ খাদ্য হয়ে উঠছে শ্রেণিভিত্তিক বিশেষাধিকার। এখানেই প্রশ্ন ওঠে-এটা কি সত্যিই নিরাপদ কৃষি আন্দোলন, নাকি নিরাপদ কৃষির মুখোশে আরেক ধরনের নব্য উপনিবেশিকতা? যার উপরে দেখতে অনেক সুন্দর, ভেতরে এক শোষণের সুপ্ত বাণিজ্য। এই ব্যবস্থায় কৃষক আবারও সরাসরি লাভবান নয়।

মধ্যখানে গড়ে উঠছে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী, স্টার্টআপ, নিরাপদ কৃষিপণ্যের মুখোশে উদ্যোক্তা, যারা নিজেদের সমাধান হিসেবে হাজির করছে। নানা কৌশলে নিজেদের প্রচারণায় ভোক্তাদের কাছে হাজির হচ্ছেন। তারা কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান, বীজ, শ্রম ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে ব্যবহার করে শহরের বাজার দখল করছে। নিরাপদ কৃষির ভাষা, লেবেল ও নৈতিকতা-সবই দখল হয়ে যাচ্ছে এক নতুন শক্তির হাতে। অথচ প্রকৃত প্রয়োজন ছিল ভিন্ন। প্রয়োজন ছিল- গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, কমিউনিটি কমিউনিটিতে নিরাপদ খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।

শুধু উৎপাদন নয়- বণ্টন, ন্যায্য দাম, স্থানীয় ভোগ এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বসহ খাদ্য-নিরাপত্তার সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গ্রামের কৃষকের নিরাপদ খাদ্য যখন অনেক ক্ষেত্রে তা চলে যাচ্ছে শহরের সুপারশপ, বিশেষায়িত দোকান কিংবা উচ্চমূল্যের বাজারে। ফলে নিরাপদ খাদ্য ধীরে ধীরে একটি পণ্যে পরিণত হচ্ছে,যার দাম দিতে পারে নির্দিষ্ট শ্রেণী।

এখানেই খাদ্য ন্যায়বিচার এর প্রশ্ন। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার যদি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে খাদ্যের নিরাপত্তাও শ্রেণিভিত্তিক হয়ে পড়ে। একজন কৃষক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করবেন, অথচ নিজের পরিবার কিংবা প্রতিবেশী সেই খাদ্য কিনতে পারবেন না-এ কেমন খাদ্যব্যবস্থা?

আরও বড় প্রশ্ন হলো খাদ্য সার্বভৌমত্বের। খাদ্য সার্বভৌমত্ব মানে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন নয়। কে বীজ বেছে নেবে, কে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেবে, কোন জ্ঞানকে মূল্য দেওয়া হবে, খাদ্য কার জন্য উৎপাদিত হবে এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে-এসব সিদ্ধান্তের ক্ষমতাও এর অংশ। কিন্তু নিরাপদ কৃষির নামে যখন সার্টিফিকেশন, ব্র্যান্ড, সেলিব্রিটি, মডেল, লেবেল ও বাজারের নতুন কাঠামো তৈরি হয়, তখন কৃষক আবারও শুধু উৎপাদক হয়ে যেতে পারেন। তার স্থানীয় জ্ঞান, শ্রম ও পরিবেশবান্ধব চর্চা বাজারের মূল্য তৈরি করে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা চলে যায় অন্যের হাতে। এখানেই নব্য উপনিবেশিকতার প্রশ্নটি আসে।

উপনিবেশিকতার পুরোনো রূপে ছিল ভূখন্ড দখল, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। নব্য উপনিবেশিকতার রূপ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এখানে বন্দুকের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন বাজার, প্রযুক্তি, জ্ঞান, নীতি, সার্টিফিকেট ও ভোক্তা-নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ। এমন কি নব্য উপনিবেশিকতার আরেকটি নতুন রূপ হলো সে ভূখন্ডের বাহির থেকে নয়, নিজ ভূখন্ডেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কৃষকের বীজ, জ্ঞান ও শ্রমকে বাজারের পণ্যে পরিণত করেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। তবে নিরাপদ কৃষিকে আমি বাজারের বিরোধী বলছি না।

কৃষকের ন্যায্য আয় এবং ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য-দুটিই জরুরি। প্রশ্ন হলো, এই বাজারের কাঠামোটি কার স্বার্থে তৈরি হচ্ছে এবং কৃষক সেখানে কতটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখছেন।

বিশ্বের কিছু অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ দেখায়। কিউবার নগর কৃষি স্থানীয় মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ও স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। জাপানের তেইকেই (ঞবরশবর)  ব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তার সরাসরি সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং উৎপাদক-ভোক্তার অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে কৃষি পণ্য সরাসরি উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়; অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও মূল্য নিয়েও কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা থাকে। ফলে নিরাপদ খাদ্যকে শুধু দূরের বাজারের পণ্য না বানিয়ে স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবেও গড়ে তোলা যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই নিরাপদ কৃষির আলোচনা শুধু কীভাবে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করব-এই প্রশ্নে আটকে থাকা উচিত নয়। আমাদের জানতে হবে-কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন কি না, স্থানীয় মানুষ নিরাপদ খাদ্য কিনতে পারছেন কি না, স্থানীয় বীজ ও কৃষকের জ্ঞান টিকে থাকছে কি না এবং খাদ্যব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকছে।

নিরাপদ কৃষিকে সত্যিকার অর্থে মানুষের কৃষি করতে হলে নিরাপদ খাদ্যকে গ্রাম, পাড়া ও কমিউনিটির খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় বাজার, কৃষক-ভোক্তার সরাসরি সম্পর্ক, কমিউনিটি সিড ব্যাংক, কমিউনিটি ভিত্তিক এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বণ্টন-এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপদ কৃষি তখন শুধু ‘সার্টিফায়েড’ পণ্য হবে না; হয়ে উঠবে মানুষের অধিকার। নইলে আশঙ্কা থেকেই যায়- সবুজ বিপ্লবের সময় কৃষিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল উৎপাদন বৃদ্ধির ভাষায়, আর এখন নিরাপদ কৃষির নামে নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে নৈতিকতা ও নিরাপত্তার ভাষায়।

তাই প্রশ্নটি কেবল কৃষির নয়, ক্ষমতারও। আমরা কি এমন নিরাপদ কৃষি চাই, যেখানে কৃষক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করবেন এবং সবাই তা খেতে পারবেন? নাকি এমন একটি বাজার চাই, যেখানে নিরাপদ খাদ্য থাকবে, কিন্তু তার নাগাল থাকবে কেবল সামর্থ্যবানদের?

ভাষা বদলালেই উপনিবেশ শেষ হয় না। কৃষকের বীজ, জ্ঞান, শ্রম ও খাদ্যের ওপর সিদ্ধান্তের ক্ষমতা যদি কৃষকের হাতেই না থাকে, তাহলে নিরাপদ কৃষির মুখোশের আড়ালেও নব্য উপনিবেশের ছায়া থেকে যেতে পারে।

লেখক: মো. শহিদুল ইসলাম
নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক

নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। টাইমস টুডের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, টাইমস টুডে কর্তৃপক্ষের নয়।